রবিবার | অক্টোবর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ মূর্তিমান আতঙ্ক, চরমপন্থি সন্ত্রাসী নুরুজ্জামান লাল্টুর উত্থান-পতন!

কুষ্টিয়া, মেহেরপুর- চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ত্রাস,

মূর্তিমান আতঙ্ক, চরমপন্থি সন্ত্রাসী নুরুজ্জামান লাল্টুর উত্থান-পতন!

শরিফ মাহমুদ, কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়া, মেহেরপুর- চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ত্রাস, এক সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক, চরমপন্থি সন্ত্রাসী নুরুজ্জামান লাল্টুর উত্থান-পতন নিয়ে এখনো রয়েছে নানা আলোচনা সমালোচনা । নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, তিনি পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই সহযোগীদের নিয়ে অস্ত্রসহ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ২০১৫ সালে মেহেরপুরের গাংনীতে তিন জনকে হত্যা মামলায় তাকে পাঁচ জনের একজন হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়াও লাল্টু জাসদ সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদসহ দলটির পাঁচ নেতাকে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ৭২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয় এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গায় তাকে দাফন করা হয়।

নুরুজ্জামান লাল্টু ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সশস্ত্র চরমপন্থি রাজনীতির সক্রিয় নেতা ছিলেন। তার নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একটি সংগঠিত গোষ্ঠী চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে সক্রিয় ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় লাল্টু ও তার বড় ভাই মতিয়ার রহমান মণ্টু গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর তার জীবনের গতিপথ পাল্টে যায়। চরমপন্থি সংগঠনে যুক্ত হন।

১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের কালিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জনসভা চলাকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে জাসদ নেতা কাজী আরেফ আহমেদসহ পাঁচ জন নিহত হন। সন্ত্রাসী দল যখন গুলি করে একর পর এক হত্যা করতে থাকে, তখন ডায়াসে দাঁড়ানো কাজী আরেফ অস্ত্রধারীদের বলছিলেন, ‘আমার লোকদের এভাবে হত্যা করো না। আমরা কী দোষ করেছি? তোমরা বললে, আমরা না হয় এখানে রাজনীতি করবো না। এভাবে মেরে কী লাভ তোমাদের?’

তখন হামলায় নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি কাজী আরেফের কাছে গিয়ে বলেন, ‘তোর নাম কী?’ কাজী আরেফ নিজের নাম বললে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘তোকেই তো খুঁজছি।’ এরপর অন্য দুজন গুলি চালালে মঞ্চের ওপরেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন কাজী আরেফ। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে লাল্টুর বাহিনীর সম্পৃক্ততার কথা এজাহারে উল্লেখ ছিল।

দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই হত্যা ঘটনার পর ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই লাল্টু তার সহযোগীদের নিয়ে চুয়াডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গায় পুলিশের কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেন। কাজী আরেফসহ পাঁচ জনকে হত্যার দায়ে লাল্টুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ছাড়া মেহেরপুরের গাংনীতে ১৯৯৪ সালে অন্য তিন জনকে হত্যার দায়ে ২০১৫ সালে নুরুজ্জামান লাল্টুসহ পাঁচ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই মামলার এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী শওকত আলী মালিথা, তার ছেলে হেলাল উদ্দিন এবং প্রতিবেশী নুর ইসলামকে হত্যা করেছিল লাল্টু বাহিনী। এ ছাড়াও লাল্টুর বিরুদ্ধে ৩০-৪০টি মামলা ছিল। যাবজ্জীবন সাজা হলেও উচ্চ আদালত থেকে ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্তি পেয়ে সাংবাদিকদের কাছে কৃষিকাজ করে জীবন কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

মানুষ হত্যার পর আলামত নিশ্চিহ্ন করে ফেলতেন লাল্টু। হত্যার পর বেশিরভাগ লাশ জ্বলন্ত ইটের ভাটায় পুড়িয়ে ফেলতেন। এছাড়া বহু মানুষকে জীবন্ত অবস্থায় হাত-পা বেঁধে ইটের ভাটায় ছুড়ে ফেলতেন, এমন বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তার এই নৃশংস কর্মকাণ্ডের অন্যতম সহযোগী ছিলেন তারই ভাতিজা বিপ্লব।

মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান লাল্টুর বাবা সিরাজুল ইসলাম পরিচিত ছিলেন ‘সিরাজ ডাকাত’ নামে। অন্যের ঘর বাড়ি ও জমি দখল ছিল তার পেশা। গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৬৩ সালে আলমডাঙ্গা থানার শিবপুর গ্রামে বলপ্রয়োগে একটি বাড়ি দখল করে এক মধ্যাহ্নে বিশ্রাম করছিলেন সিরাজ ডাকাত। অতর্কিতভাবে গ্রামবাসীর হামলায় তিনি মারা যান।

১৫২ বন্দিসহ কারাগার ভেঙে পালিয়ে যান মন্টু-লাল্টু।

দেশ স্বাধীনের পর গ্রেফতার হয়েছিলেন মন্টু ও লাল্টু দুই ভাই। চুয়াডাঙ্গা উপ-কারাগারে থাকাকালে ১৫২ জন হাজতি ও কয়েদিসহ কারাগার ভেঙে পালিয়ে যান ১৯৭৩ সালের ১৪ জুলাই। এটা ঘটে তাদের নেতৃত্বেই। জনশ্রুতি আছে, ওই ঘটনার আগে লাল্টুর সঙ্গে কারাগারে দেখা করেন তার মা। তিনি লাল্টুর জন্য কাঁঠাল নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই কাঁঠালের ভেতরেই লাল্টুর জন্য দেওয়া হয়েছিল অস্ত্র। সেই অস্ত্র দিয়েই কারাগারে বিদ্রোহ করেন এবং তিনিসহ কারাগারের সবাইকে পালাতে সহায়তা করেন।

এরপর তার আরেক ভাই আন্টু নিহত হন ১৯৭৪ সালে। দুই ভাই এ সময় সশস্ত্র লাইনে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। ১৯৭৪ সালের ২১ মার্চ মেহেরপুরের ট্রেজারির অস্ত্রাগার লুট করতে গিয়ে বড় ভাই মন্টুও নিহত হন।

১৯৭৫ সালের ৩০ মে চুয়াডাঙ্গা সদরের নুরুল্লাপুর গ্রাম থেকে লাল্টু তার নয় সহযোগীসহ গ্রেফতার হন। প্রায় ৯ বছর পর ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান। এরপর লাল্টু স্বাভাবিক জীবনে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। জীবিকার প্রয়োজনে পশু বেচাকেনা ও স্থানীয় গোকুলখালী বাজারে আড়তদারি ব্যবসা শুরু করেন গ্রামবাসীর ভাষ্যমতে, এ সময় তিনি তীব্র হতাশায় ছিলেন। আর্থিক সংকটে পড়েন। এছাড়া ওই অঞ্চলে গোপন কিছু সশস্ত্র গ্রুপের কারণে তার জীবনযাপনও ছিল হুমকির মুখে। ১৯৮৭ সালে আলমডাঙ্গা থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার নির্বাচিত হন লাল্টু।

১৯৯৬ সালে লাল্টু পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বিতাড়িত হয়ে ভারতে চলে যান। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অস্ত্র ছিনতাইয়ের অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ লাল্টু পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে আটক হন। তিন মাস কারাভোগের পর ছাড়া পান।

দেশে ফিরে ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই লাল্টু খুলনার তৎকালীন ডিআইজি লুৎফুল কবিরের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সে সময় একটি প্রভাবশালী মহল চেয়েছিল, লাল্টু যেন আত্মসমর্পণ না করে। আর করলেও যেন তার সাজা মওকুফের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু জনমতের চাপে সরকার তাকে আটক রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুনের ওপরও প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয় লাল্টু, ভাতিজা বিপ্লবসহ বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ক্যাডারদের আত্মসমর্পণে। এটা বুঝতে পেরে লাল্টু আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন।

আত্মসমর্পণের সময় দেওয়া বক্তব্যে লাল্টু বলেছিলেন, ১৯৯১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মারফত ভাই (মুক্তিযোদ্ধা মারফত আলী, কুষ্টিয়ার মীরপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান) খুন হলে তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এর পরপরই তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করে একদল লোক। এ অবস্থায় ১৯৯২ সালে যোগদান করেন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে। কিন্তু ১৯৯৫ সালের ৬ জুলাই দামুড়হুদার কুলবিলা গুচ্ছগ্রামে পার্টির সশস্ত্র ক্যাডাররা আট কৃষককে হত্যা করলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে দলত্যাগ করেন। পার্টি তার মৃত্যুদণ্ড দেয়। ফলে পালিয়ে ভারতে চলে যান। সেখান থেকে ফিরে আসার পর আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই তিনি একটি গ্রুপ গঠন করেন।

২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর লাল্টু সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ৩০টিরও বেশি মামলা হয়েছিল, যার বেশির ভাগই হত্যা মামলা। এর মধ্যে তিনটি মামলায় সাজা হয়। বাকি মামলাগুলো থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন। যে তিনটি মামলায় সাজা হয়েছিল, তার দুটো মামলায় আগেই জামিনে ছিলেন। সর্বশেষ মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ায় ১৯ বছর পর কারামুক্ত হলেন।

সেদিন নুরুজ্জামান লাল্টু বলেছিলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯ বছর পর কারামুক্ত হলাম। আলোর মুখ দেখলাম। এবার কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করবো। যারা চরমপন্থি-সন্ত্রাসী, তাদের বলবো আলোর পথে ফিরে আসো। সন্ত্রাসে শান্তি নেই।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ৩০ মার্চ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডার চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার চারুলিয়া গ্রামের রুহুল আমিন গ্রেফতার হয়। তার স্থানে দলের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক কমান্ডার হন তার ভাই সবুজ। পূর্ব বাংলার এই ভঙ্গুর অবস্থায় লাল্টু অত্যন্ত দ্রুত নিজের সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে তোলেন। তার সঙ্গে যোগ দেয় পূর্ব বাংলার কিছু সদস্য, সিরাজ বাহিনীর বেশ কয়েকজন সশস্ত্র ক্যাডার এবং ছোট সন্ত্রাসী ডাকাত গ্রুপ।

জনশ্রুতি আছে, তার সশস্ত্র গ্রুপকে শক্তিশালী এবং পূর্ব বাংলার অবস্থান দুর্বল করতে লাল্টু প্রভাবশালী নানা মহলের সহায়তা পান। ১৯৯৮ সালের ১ ডিসেম্বর লাল্টু গঠন করে ‘বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’। লাল্টু খুব দ্রুত তার বাহিনীকে সংগঠিত করে পূর্ব বাংলা ও সিরাজ বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করেন। ত্রিপক্ষীয় ওই সংঘাতে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর এবং কুষ্টিয়ার একাংশের আত্মসমর্পণের পূর্ব পর্যন্ত লাশ পড়তে থাকে একের পর এক। কিন্তু লাল্টু ছিলেন ব্যতিক্রম। আত্মসমর্পণের পূর্ব পর্যন্ত লাল্টুর ‘বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’ আলমডাঙ্গা থানার কালিদাসপুর ইউনিয়ন ছাড়া সব ইউনিয়ন, চুয়াডাঙ্গা সদরের সব ইউনিয়ন এবং দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলার একাংশে তার কর্তৃত্ব পুরোপুরি বজায় রাখেন।

লাল্টুর বিরুদ্ধে সহজে কেউ হত্যা মামলা দায়েরের সাহসও পেতো না। এরপরও তার বিরুদ্ধে ২১টি হত্যাসহ ২৬টি মামলা হয়েছিল। আত্মসমর্পণের পর তা আরও বাড়ে। দুটি মামলায় যাবজ্জীবনসহ ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়। ১৯৯৩ সালের ১০ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় একটি হত্যা মামলাসহ অর্ধশতাধিক মামলায় কারাগারে বন্দি ছিলেন লাল্টু।

২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্ত হন। ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গায় নিজ বাড়িতে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর ৭২ বছর বয়সে লাল্টুর মৃত্যু হয়। পরদিন সকাল ১০টায় ওই গ্রামে তার প্রতিষ্ঠিত স্টেডিয়ামে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এক সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক লাল্টুর উত্থান- পতনের গল্পের পরিসমাপ্তি ঘটলেও যুগে যুগে তাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা মানুষের মুখে মুখে থেকেই যাবে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা