পিরোজপুর থেকে এস,এম সিপার : একটি হামলার পর থমকে যায় তার স্বাভাবিক জীবন। একসময় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মোতালেব আকন টানা ১২ বছর ধরে শয্যাশায়ী। বুকের নিচের অংশে অনুভূতি নেই। দীর্ঘদিন বিছানায় পড়ে থাকায় শরীরে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত। এবার সেই ক্ষতের চিকিৎসায় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছেন পিরোজপুরের এই বিএনপি নেতা।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, তার চিকিৎসায় পর্যায়ক্রমে তিনটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
গত ৫ অক্টোবর তাকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্ট ও কাশিতে ভোগার পাশাপাশি তার ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার অংশ হিসেবে বেডসোর বা চাপজনিত ক্ষতগুলোর অস্ত্রোপচারের আগে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। পুরো চিকিৎসায় প্রায় তিন মাস হাসপাতালে থাকতে হতে পারে।
মোতালেব আকনের কোমরের নিচের পেছনের অংশে তৈরি হয়েছে গুরুতর বেডসোর। এর মধ্যে দুটি ক্ষত প্রায় দুই ইঞ্চি গভীর। ক্ষতগুলো সারাতে শরীরের অন্য স্থান থেকে মাংসপেশি বা টিস্যু নিয়ে অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে অস্ত্রোপচারের আগে ফুসফুসের জটিলতাসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মোতালেব আকনের শয্যাশায়ী জীবনের শুরু ২০১৪ সালে। তার অভিযোগ, ওই বছর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি-মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা শেষে বাড়ি ফেরার পথে আওয়ামী লীগের লোকজনের হামলার শিকার হন তিনি। ওই হামলায় তার মেরুদণ্ড দুই ভাগ হয়ে যায় এবং স্পাইনাল কর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে বুকের নিচের অংশের অনুভূতি হারিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি।
সেই থেকে দীর্ঘ ১২ বছর বিছানায় কাটছে তার জীবন। দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে গভীর ক্ষত ও ফুসফুসের সমস্যা। সামনে একাধিক অস্ত্রোপচার এবং দীর্ঘ চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার পরিবারের।
গত বছর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেশ টিভিতে মোতালেব আকনকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। প্রতিবেদনটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নজরে এলে তিনি ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনকে মোতালেব আকনের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দেন।
এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৬ অক্টোবর বিকেল চারটায় ভিডিও কলে মোতালেব আকনের সঙ্গে কথা বলেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। ভিডিও কলে কথা বলার সময় মোতালেব আকনের বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রধান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। এ ছাড়া সংগঠনটির আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের নেতৃত্বে উপদেষ্টা, সদস্যসচিব সহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মোতালেব আকনের বড় ছেলে তাসরিফ হোসেন বলেন, “একজন সন্তান হিসেবে বাবার এই কষ্ট সহ্য করা বড়ই কঠিন। দেশবাসীর কাছে আমার বাবার সুস্থতার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া চাই। মহান আল্লাহ যেন তাকে দ্রুত সুস্থতা দান করেন।”
জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক সাংবাদিক সাঈদ খান বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার বিএনপির নেতা-কর্মীদের পাশে দল অতীতেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। দীর্ঘদিনের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে যারা দলের জন্য অবদান রেখেছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও সহযোগিতা করা আমাদের দায়িত্ব।
বর্তমানে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে সরকার বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও কর্মব্যস্ততার কারণে হয়তো সবার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না, তবে তাঁর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কোনো নেতা-কর্মীর হতাশ হওয়ার কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমরা আশা করি, পিরোজপুরের বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা মোতালেব আকনের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণীর সহানুভূতিশীল বিবেচনায় আসবে। তার সুচিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার পথে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া গেলে তা হবে তার দীর্ঘদিনের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোর একটি মানবিক উদ্যোগ।”
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাএদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারন সম্পাদক শাকিল আহম্মেদ বলেন,
ফ্যাসিবাদী আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে হামলার শিকার পিরোজপুর জেলা বিএনপির নেতা মোতালেব আকন চাচা ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছে।
দীর্ঘ ১২ বছর মোতালেব চাচা অসুস্থতার সঙ্গে
যুদ্ধ করছেন। যা সত্যিই অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সর্বদা চাচার কষ্ট অনুভব করছি। হে মহান আল্লাহ অতি দ্রুত তাকে
সুস্থ করে আমাদের মাজে ফিরিয়ে দিন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর জীবনে নতুন আশার আলো ফিরে আসুক।
এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
শাকিল আরো বলেন
বলেন, প্রবীণদের সম্মান জানানো এবং তাদের অভিজ্ঞতা ও অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন পিরোজপুর জেলাবাসী তা কোন দিনই ভূলতে পারবে না।
মানবিকতা শুধু কথায় নয়, মানুষের বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই তার প্রকৃত পরিচয় দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানে। আমরা চাই, মোতালেব চাচা অসহায়ত্ব নয়—নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাক।
দীর্ঘ ১২ বছর পরও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই থামেনি মোতালেব আকনের। এবার তার পরিবারের আশা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে তার শারীরিক অবস্থার
আমুল পরিবর্তন হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।
