মেহেদী হাসান সিরাজী মহেশপুর(ঝিনাইদাহ) প্রতিনিধিঃ ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়নের কৌশলগত ও ঐতিহ্যবাহী সাতটি মৌজা পার্শ্ববর্তী যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত করার নতুন অপচেষ্টার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চার দশক ধরে চলে আসা প্রশাসনিক সীমানা টানাটানির চূড়ান্ত সুরাহা করে মহেশপুরেই বহাল রাখার দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন সর্বস্তরের মানুষ।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়নের পুড়াপাড়া বাজারে এক বিশাল মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। ‘চৌগাছায় যেতে চাই না, মহেশপুরেই থাকতে চাই’—এই স্লোগানে মুখরিত মানববন্ধনে শ্যামনগর, বিশ্বনাথপুর, কমলাপুর, আলিশা, যদুনাথপুর, পাঁচবাড়িয়া ও ডাড়িপাড়া এই সাতটি গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিক দলমত নির্বিশেষে অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হঠাৎ করেই একটি স্বার্থান্বেষী ও কুচক্রী মহলের ইন্ধনে এলাকার মানুষের আবেগ ও বাস্তব সুবিধাকে তোয়াক্কা না করে ৭টি মৌজাকে চৌগাছা উপজেলার সঙ্গে যুক্ত করার চক্রান্ত চালানো হচ্ছে। এলাকাবাসী জীবন দিয়ে হলেও এই অপচেষ্টা প্রতিহত করবে। কোনো অবস্থাতেই তারা ঝিনাইদহ জেলা ও মহেশপুর উপজেলার মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়নের বাঁধন ছিঁড়ে চৌগাছায় যুক্ত হবেন না।
বক্তারা তুলে ধরেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সাতটি গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়ন তথা মহেশপুরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। গ্রামগুলোর একেবারেই কাছে গড়ে উঠেছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পোস্ট অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস। দীর্ঘকাল ধরে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তারা সুফল পাচ্ছেন। হঠাৎ চৌগাছায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে দৈনন্দিন সরকারি সেবাপ্রাপ্তি ও যাতায়াতে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হবে। তাই জনস্বার্থ ও যাতায়াত সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে সীমানা বহাল রাখার জোর দাবি জানান তারা।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আমিনুর রহমান, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান এস এম জগলুল পাশা, মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ মমিনুর রহমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রভাষক আতিকুর জামান শিপন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক এস এম হোসেন জাফরিন পাশা, মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মোঃ আমিনুল রহমান ও ফসিয়ার রহমান, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মোঃ আতিয়ার রহমান এবং ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মোঃ আব্দুল আলিমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এ সময় সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা একসুরে জানান, জনমত উপেক্ষা করে কোনো একপেশে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
নথিপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই সীমানা বিরোধের ইতিহাস বহু পুরোনো।
১৯৮৮ সালে নিকার-এর ৫৫তম বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে গ্রামগুলোকে মহেশপুর থেকে কেটে চৌগাছায় দেওয়া হয়।
১৯৯৪ সালে তীব্র স্থানীয় দাবির মুখে
১৯৯৪ সালের ৪ অক্টোবর নিকার-এর ৮১তম বৈঠকের সিদ্ধান্তক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি করে মৌজাগুলোকে পুনরায় মহেশপুরে ফিরিয়ে আনা হয়।
২০০১ সালের ৯ মে নিকার-এর ৮৬তম বৈঠকে পুনরায় চৌগাছায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে মান্দারবাড়ীয়া ইউপির তৎকালীন সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম সর্দার হাইকোর্টে রিট করেন। ফলে হাইকোর্ট রুল জারি করে স্থগিতাদেশ দেন।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট রিটটি খারিজ করলেও প্রশাসনিক সীমানার চূড়ান্ত রূপ অনিশ্চিত থেকে যায়।
সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তিতে সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ চৌগাছা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এবং ৩০ মার্চ মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদে খুলনা বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। খুলনার তৎকালীন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আব্দুর রশিদ এতে শুনানি পরিচালনা করেন এবং হাজারও মানুষের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করেন।
তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই গণশুনানির প্রতিবেদন প্রকাশ বা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীর আকুল আবেদন, বিভাগীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যেন দ্রুত হাজার হাজার মানুষের গণদাবি বিবেচনা করে এই সাত মৌজাকে স্থায়ীভাবে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়নে বহাল রাখার প্রজ্ঞাপন জারি করে।
