মো. ইলিয়াছ মাহমুদ : বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, ভাতা বৃদ্ধি, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও তাঁদের প্রজন্মের কর্মসংস্থানের দাবি
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিতসহ পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম কাউন্সিল। এসব দাবি বাস্তবায়নে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরেন সংগঠনটির নেতারা।
সমাবেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করা, সম্মানী ভাতা বৃদ্ধি, বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা, তাঁদের সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়ন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সমাবেশ থেকে উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবি হলো—
১. বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা: বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আইনগত অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। তাঁদের প্রতি অপমান, হয়রানি, বৈষম্য, নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের জমি-জমা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় বিনামূল্যে সরকারি আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া প্রত্যেক বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান, গার্ড অব অনার ও সম্মানজনক দাফনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
২. সম্মানী ভাতা বৃদ্ধি ও আবাসন নিশ্চিত করা: বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিবেচনায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ভাতা সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি অসচ্ছল, ভূমিহীন ও গৃহহীন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের জন্য সরকারি উদ্যোগে বসবাসযোগ্য ঘর ও জমির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
৩. বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা: দেশের সব জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে তাঁদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রদানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে পৃথক চিকিৎসা সহায়তা সেল গঠনের দাবি তোলা হয়।
৪. মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান: অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিনামূল্যে মানসম্মত কারিগরি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়। দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
৫. মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া: দেশের জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ, অভিজ্ঞতা, দলিল ও ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়। তাঁদের অবদান ও বীরত্বগাথা জাতীয় আর্কাইভে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং যথাযথ গবেষণা ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতা অর্জনের সঠিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবহিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সমাবেশে উত্থাপিত দাবিগুলোকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নয়, বরং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ার জাতীয় দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অঙ্গীকার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁদের আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জাতির সম্মিলিত দায়িত্ব।
