মোঃ আবদুল মান্নান
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের খবর এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং প্রায় প্রতিদিনের বাস্তবতা। সংবাদপত্র খুললেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যায় নতুন কোনো শিশুর আর্তনাদ, নতুন কোনো পরিবারের শোক, নতুন কোনো মায়ের কান্না। এসব ঘটনা সমাজকে শুধু ক্ষুব্ধই করে না, একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়েও গভীর প্রশ্ন তোলে। রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা সেই প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। মানুষের ক্ষোভ, হতাশা ও বেদনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকে কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির দাবি তুলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “দ্য ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম” নতুন করে আলোচনায় আসার পেছনেও এই ক্ষোভ কাজ করছে। চলচ্চিত্রটির কাহিনিতে ভয়াবহ অপরাধের শাস্তি হিসেবে ধাপে ধাপে অঙ্গচ্ছেদের মতো নির্মম ব্যবস্থাকে দেখানো হয়েছে। অনেকেই এটিকে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন—একটি সমাজ যখন বিচার পায় না, যখন অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের ভেতরে প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা তৈরি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো সভ্য রাষ্ট্র কি প্রতিশোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে? রাষ্ট্রের কাজ কি মানুষের ক্ষোভকে আইন বানিয়ে ফেলা, নাকি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা? বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ধর্ষণ ও শিশুধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় মানুষের আস্থা কমছে। যখন মানুষ দেখে প্রভাবশালী অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা বা প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে, তখনই তারা আইনের প্রতি আস্থা হারায়। তখন তারা কঠোর শাস্তির দাবি তোলে, কখনো কখনো আইনের বাইরে গিয়ে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থাকেও সমর্থন করতে শুরু করে। এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিফলন। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংগঠন, সংবাদমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর শত শত শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে, যাতে অপরাধের সাক্ষ্য মুছে ফেলা যায়। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধী পরিচিত মানুষ—আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা পরিবারের পরিচিত কেউ। অর্থাৎ শিশুর নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় নয়, ঘরের ভেতরেও হুমকির মুখে। এ অবস্থার জন্য কেবল অপরাধীকেই দায়ী করলে চলবে না; রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই নিজেদের দায় স্বীকার করতে হবে। একটি শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; সেটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা, সামাজিক শিক্ষার ব্যর্থতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। কারণ একটি সুস্থ সমাজ অপরাধ ঘটার আগেই প্রতিরোধমূলক পরিবেশ তৈরি করে। বাংলাদেশ কি সেই পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে? বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো শিশু সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে নিতে পারিনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিরাপত্তা বিষয়ে কার্যকর শিক্ষা নেই, পরিবারে শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হয় না, অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতনের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া হয় সামাজিক লজ্জার ভয়ে। অপরাধীকে রক্ষা করার প্রবণতা আমাদের সমাজে ভয়াবহভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বা নিম্নআয়ের পরিবারে ধর্ষণের ঘটনা প্রায়ই স্থানীয় সালিশ, অর্থের বিনিময় বা সামাজিক চাপের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। এটি শুধু অন্যায় নয়; বরং অপরাধকে উৎসাহিত করার সামিল। সরকার অবশ্য ধর্ষণবিরোধী আইন কঠোর করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়ালেই কি অপরাধ কমে? বিশ্বের বহু গবেষণা বলছে, অপরাধ দমনে শাস্তির ভয় যতটা কার্যকর, তার চেয়ে বেশি কার্যকর হলো নিশ্চিত বিচার। অর্থাৎ অপরাধী যদি বিশ্বাস করে যে সে যেভাবেই হোক পার পেয়ে যাবে, তাহলে মৃত্যুদণ্ডও তাকে থামাতে পারে না। বাংলাদেশে এই জায়গাটিই সবচেয়ে দুর্বল। অনেক আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেখা গেছে তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেছে, সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়েছে, সাক্ষীরা ভয় পেয়েছে, কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে মামলা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কখনো কখনো তদন্ত কর্মকর্তার গাফিলতি, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রসিকিউশনের দুর্বলতাও বিচারকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে বিচার বিলম্বিত হয়, আর বিলম্বিত বিচার অনেক সময় কার্যত বিচারহীনতায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই ধর্ষণ ও শিশুধর্ষণ রোধ করতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হতে হবে বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। একটি ধর্ষণের মামলা যেন বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে। তদন্ত যেন পেশাদার ও বিজ্ঞানভিত্তিক হয়। ফরেনসিক পরীক্ষাগারকে আধুনিক করতে হবে, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, সাক্ষী সুরক্ষা কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশেষ সেল গঠন প্রয়োজন। বাংলাদেশে অনেক পরিবার মামলা চালিয়ে যেতে পারে না অর্থনৈতিক কারণে। আদালতে যাতায়াত, আইনজীবীর খরচ, সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে তারা একসময় ভেঙে পড়ে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু মামলা নেওয়া নয়; বরং ভুক্তভোগী পরিবারকে সম্পূর্ণ সহায়তা দেওয়া। একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন পুরো পরিবার মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে এখনো ট্রমা কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন বা দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা সীমিত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুলিশি সংস্কার। ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে অনেক পরিবার এখনো হয়রানির শিকার হয়। কোথাও মামলা নিতে অনীহা, কোথাও আপসের চাপ, কোথাও আবার ভুক্তভোগীকেই সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা রয়েছে। এসব আচরণ শুধু অমানবিক নয়; বরং বিচারপ্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সংবেদনশীল, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় প্রশিক্ষিত তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ জরুরি। সমস্যার আরেকটি দিক হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় অপরাধীদের রক্ষা করে। দলীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার সম্পর্ক বিচারকে প্রভাবিত করে। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করে আইন সবার জন্য সমান নয়। এই ধারণা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে গেলে সমাজে প্রতিশোধমূলক মনোভাব বাড়ে। তখন মানুষ কঠোর ও অমানবিক শাস্তির দাবিকে সমর্থন করতে শুরু করে। “দ্য ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম” নিয়ে আলোচনার ভেতরে তাই শুধু একটি চলচ্চিত্রের প্রভাব নেই; আছে জনগণের জমে থাকা ক্ষোভ। মানুষ মূলত বলতে চাইছে—অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই রেহাই না পায়। এই বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সভ্য বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচার। রাষ্ট্র যদি প্রতিশোধের পথে হাঁটে, তাহলে সেটি শেষ পর্যন্ত আইনের শাসনকে দুর্বল করে। কারণ নির্মম শাস্তি সমাজে সাময়িক তৃপ্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তোলে না। বিশ্বের অনেক দেশ মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে এই যুক্তিতে যে রাষ্ট্রের কাজ মানবাধিকার রক্ষা করা। আবার অনেক দেশ কঠোর শাস্তি বহাল রেখেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এর মানে হলো, সমস্যার সমাধান শুধু শাস্তির ধরনে নয়; বরং বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে প্রয়োজন কার্যকর, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা। দ্রুত বিচার আইন নিয়ে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন দ্রুত বিচার করতে গিয়ে যেন ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এই উদ্বেগ অমূলক নয়। কারণ বিচার দ্রুত হতে হবে ঠিকই, কিন্তু তা অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে। অন্যথায় নিরপরাধ কেউ শাস্তি পেতে পারে, যা বিচারব্যবস্থার জন্য আরও ভয়াবহ। তাই প্রয়োজন দক্ষতা ও স্বচ্ছতা—হঠকারিতা নয়। একই সঙ্গে সমাজে যৌন সহিংসতার মূল কারণগুলো নিয়েও আলোচনা জরুরি। আমরা প্রায়ই শুধু ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করি, কিন্তু প্রতিরোধের বিষয়টি অবহেলিত থাকে। শিশুদের নিরাপত্তা শিক্ষা, অনলাইন নিরাপত্তা, পর্নোগ্রাফির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, মাদকাসক্তি, নারীর প্রতি অবমাননাকর মনোভাব—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম—সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। বাংলাদেশে যৌন শিক্ষা নিয়ে এখনো সামাজিক সংকোচ রয়েছে। অথচ শিশুকে তার শরীর সম্পর্কে সচেতন করা, কোন আচরণ অনুচিত তা শেখানো, বিপদের সময় কোথায় সাহায্য চাইতে হবে—এসব শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশু নির্যাতনের শিকার হলেও বুঝতে পারে না যে সে অপরাধের শিকার হয়েছে। আবার ভয় বা লজ্জায় কাউকে বলতে পারে না। এই নীরবতাই অপরাধীদের শক্তি বাড়ায়। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ধর্ষণের সংবাদ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা ভুক্তভোগীর জন্য আরও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা প্রয়োজন—যেখানে অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরা হবে, কিন্তু ভুক্তভোগীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হবে না। সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণকে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া যে রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। কোনো শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে শুধু বিবৃতি দিলেই হবে না; দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। তদন্তের অগ্রগতি জনসম্মুখে জানাতে হবে, আদালতের কার্যক্রম স্বচ্ছ রাখতে হবে এবং বিচার কার্যকর হওয়ার পর সেটি দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপন করতে হবে। মানুষ যখন দেখে অপরাধী দ্রুত ও ন্যায্য শাস্তি পেয়েছে, তখন আইনের প্রতি আস্থা বাড়ে। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি সত্যিই ধর্ষণবিরোধী অবস্থান নিতে চায়, তাহলে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া অপরাধকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করে। একটি সমাজে যখন ক্ষমতাবান অপরাধী রক্ষা পায়, তখন সাধারণ অপরাধীরাও সাহস পায়। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো জরুরি। ডিজিটাল কেস ট্র্যাকিং, অনলাইন সাক্ষ্যগ্রহণ, ফরেনসিক ডাটাবেস, ডিএনএ পরীক্ষার দ্রুততা—এসব ব্যবস্থা বিচারকে কার্যকর করতে পারে। বর্তমানে অনেক মামলায় ডিএনএ রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যা বিচার বিলম্বিত করে। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া যৌন অপরাধ দমন কার্যকরভাবে সম্ভব নয়। শিশু সুরক্ষায় স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটিকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় করা যেতে পারে। স্কুলে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি, অভিভাবক প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। শিশুরা কোথায় নিরাপদ নয়, কোন পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ—এসব বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্ষণ শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকটও। নারীর প্রতি অসম্মান, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে এ অপরাধের জন্ম হয়। তাই শুধু শাস্তি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, যদি সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন না হয়। পরিবারে ছেলেশিশুকে নারীকে সম্মান করতে শেখাতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। পল্লবীর ঘটনাটি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশে শিশু নিরাপত্তা এখন জরুরি জাতীয় ইস্যু। এই বাস্তবতায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ, জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যম। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক। রাষ্ট্রকে প্রতিশোধমূলক নিষ্ঠুরতার দিকে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং কার্যকর ন্যায়বিচারের পথে বাধ্য করা প্রয়োজন। যখন মানুষ “উইলি বিংহাম”-এর মতো শাস্তির কথা বলে, তখন তারা মূলত বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। এই ক্ষোভকে অবহেলা করলে চলবে না। বরং সরকারকে বুঝতে হবে, জনগণ বিচার চায়—দ্রুত, দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ বিচার। যদি রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে, যা রাষ্ট্রের জন্য আরও বিপজ্জনক। এখানে মানবাধিকার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভয়াবহ অপরাধের বিচার করতে গিয়ে রাষ্ট্র যদি অমানবিক শাস্তির পথ বেছে নেয়, তাহলে সেটি শেষ পর্যন্ত মানবিক রাষ্ট্রের ধারণাকেই দুর্বল করে। বিচারব্যবস্থার শক্তি তার নির্মমতায় নয়; বরং তার ন্যায়পরায়ণতায়। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে অপরাধী শাস্তি পাবে নিশ্চিতভাবে, কিন্তু বিচার হবে আইনের শাসনের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের সংবিধান আইনের শাসন ও মানবাধিকারের কথা বলে। সেই আলোকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অপরাধ দমন করতে গিয়ে প্রতিশোধপরায়ণ নিষ্ঠুরতার পথে না গিয়ে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
ধর্ষকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিচার এখন সময়ের দাবি
প্রকাশিতঃ মে ২৪, ২০২৬, ১৭:০১