বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ বদলি আদেশের ৫ মাস পরও আগের পদে কর্মকর্তা, আড়ালে প্রতিদিন কোটি টাকার ‘পেঁয়াজ সিন্ডিকেট’

বদলি আদেশের ৫ মাস পরও আগের পদে কর্মকর্তা, আড়ালে প্রতিদিন কোটি টাকার ‘পেঁয়াজ সিন্ডিকেট’

স্টাফ রিপোর্টার : কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি বদলি আদেশ দীর্ঘ পাঁচ মাস বাস্তবায়িত না হওয়া, তা বাতিল করে নতুন পদায়ন এবং একই সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিদেশ প্রশিক্ষণের সরকারি অনুমোদন (জিও) দেওয়ার ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রশাসনিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই নজিরবিহীন প্রশাসনিক খামখেয়ালিপনার পেছনে রয়েছে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি শক্তিশালী ‘পেঁয়াজ আমদানি পারমিট (IP) সিন্ডিকেট’। এই চক্রটি অনলাইন সফটওয়্যার ব্লক করে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে সরকারের পেঁয়াজ আমদানির মহৎ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
প্রশাসনিক নজিরবিহীন ঘটনা ও প্রশ্নবিদ্ধ জিও
মন্ত্রণালয়ের নথি ও প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) বনি আমিন খানকে হর্টিকালচার উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (ফুল ও ফল) পদে বদলি করা হয়। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। কিন্তু বনি আমিন খান পূর্বের পদেই বহাল থাকেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি।
এরই মধ্যে, গত ৮ জুন ২০২৬ তারিখে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৩ শাখা থেকে জারি করা এক সরকারি আদেশে (GO) বনি আমিন খানকে পূর্বের পদেই (আমদানি শাখা) বহাল দেখিয়ে Russian System of Quarantine Phytosanitary Control, Grain Quality and Safety Control and Pesticide Residue Control Programme”-এ অংশগ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ১৪ থেকে ১৯ জুন ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

প্রশাসনিক এই অসঙ্গতি ঢাকতে গত ১০ জুন তারিখে দ্রুত আরেকটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বনি আমিন খানকে কাগজ-কলমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) থেকে নড়াইলের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) পদে পুনরায় পদায়ন করা হয়। একই সাথে ১ ফেব্রুয়ারির বদলি আদেশটি বাতিল করা হয়। ৫ মাস আদেশ বাস্তবায়ন না করে, বিদেশ যাওয়ার জিও জারির পর তড়িঘড়ি করে পদায়ন বদলানোর এই ঘটনাকে প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা নজিরবিহীন ও নিয়মবহির্ভূত বলে আখ্যা দিয়েছেন।
নেপথ্যে গাজীপুর সিন্ডিকেট ও প্রতিদিন ১ কোটি টাকার বাণিজ্য
কেন একজন কর্মকর্তাকে বদলির পরও ৫ মাস যাবত অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘আমদানি’ শাখায় ধরে রাখা হলো—তার উত্তর মিলেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি) ও সংগনিরোধ উইংয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রে। অভিযোগ উঠেছে, এর পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সিন্ডিকেট, যা ‘গাজীপুর সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত।
দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনলাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ জনকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (IP) প্রদানের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই নিয়মকে পুুঁজি করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল কালোবাজারি চক্র।
অভিযোগের তীর যেখানে:
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই সিন্ডিকেট চক্রের সাথে খোদ কৃষি সচিবের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। চক্রের মূল কুশীলবরা হলেন খামারবাড়ির অতিরিক্ত উপপরিচালক বনি আমিন খান, অতিরিক্ত উপপরিচালক সাব্বির আহমেদ এবং তাদের সহযোগী সাজেদুল। চক্রের মূল ব্যক্তিরা সবাই গাজীপুর জেলার বাসিন্দা হওয়ায় এবং সচিবের বাড়িও একই অঞ্চলে হওয়ায় অত্যন্ত নিবিড় ও প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটটি গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে খামারবাড়ির সাধারণ কর্মকর্তা বা আমদানিকারকদের কথা বলার কোনো সাহস নেই।
রেলের টিকিটের মতো আইপি কালোবাজারি
সিন্ডিকেটের কার্যপদ্ধতি হুবহু রেলের টিকিট কালোবাজারির মতো। সূত্র জানায়, বনি আমিন খান আইটি বা সফটওয়্যার কোম্পানির প্রকৌশলীদের সাথে যোগসাজশ করে সরকারি অনলাইন সফটওয়্যারটিতে কৃত্রিম জ্যাম বা ‘ব্লক’ সৃষ্টি করে রাখেন। ফলে সাধারণ আমদানিকারকরা শত চেষ্টা করেও নির্দিষ্ট সময়ে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারেন না।
সকাল ১০টায় যখন অনলাইন পোর্টালটি খোলা হয়, তখন সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মাত্র ২১ সেকেন্ডের মধ্যে ৫০ জনের আবেদনের কোটা পূর্ণ (ফিলাপ) হয়ে যায়। এই ২১ সেকেন্ডের মধ্যেই সিন্ডিকেট তাদের পছন্দের বা পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তিদের নাম তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়।
প্রতি পারমিটের মূল্য: ২ লক্ষ টাকা। দৈনিক কোটা: ৫০টি অনুমতিপত্র।
প্রতিদিনের অবৈধ আয়:৫০ × ২, লাখ = ১ কোটি টাকা। অর্থ আদায়ের দায়িত্বে রয়েছেন মাঠপর্যায়ের সহযোগী সাজেদুল এবং এই পুরো প্রক্রিয়ার কারিগরি ও প্রশাসনিক সমন্বয়কের (সার্বিক দায়িত্বে) ভূমিকা পালন করছেন অতিরিক্ত উপপরিচালক বনি আমিন খান।
প্রশাসনিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মত
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ১ ফেব্রুয়ারির বদলি আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় একজন কর্মকর্তা কীভাবে ৫ মাস একই পদে বহাল থাকেন, তার কোনো বৈধ ব্যাখ্যা নেই। যদি কোনো লিখিত স্থগিতাদেশ না থাকে, তবে এটি স্পষ্ট প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ। আর এই শৃঙ্খলাভঙ্গের পেছনে যদি প্রতিদিন কোটি টাকার আর্থিক সংশ্লিষ্টতা ও সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্য থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
জনস্বার্থের পেঁয়াজ আমদানির অনুমতিপত্রকে এভাবে ২১ সেকেন্ডের ডিজিটাল কারসাজিতে রূপান্তর করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা