শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর

ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়

# চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ৮টি সমঝোতা ও ৩টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে
# মোংলা বন্দর ও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ইপিজেড নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে
# তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে
# কুনমিং-বাংলাদেশে যোগাযোগে চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোর প্রস্তাব

হাবিবুর রহমান: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মাধ্যমে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্যসমাপ্ত চীন সফরকে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা। চার দিনের এ সফরে দুই দেশ শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকারই করেনি, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গঠনের সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত সহযোগিতাকে আরও গভীর করার রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে। চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং অন্য দেশের সরকারপ্রধানকে বসিয়ে রেখে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন।
জানা গেছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথভাবে দুই দেশের মধ্যে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। এর ফলে বিদ্যমান কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু প্রতীকী ঘোষণা নয়, বরং আগামী বছরগুলোতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ দফার যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণার পাশাপাশি অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। এসব সমঝোতা ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প ও বিনিয়োগের পথ সুগম করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। যদিও এ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে এ ধরনের করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগ ব্যবস্থায় নতুন সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ চীনের প্রস্তাবিত গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যোগ দেওয়ার পর এটিই চীনের আরেকটি বড় বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা। এর ফলে উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে চীনা প্রেসিডেন্টের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন। দুই দেশ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সম্ভাবনা যাচাই করতে সম্মত হয়েছে। একইসঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, উচ্চপর্যায়ের সফর এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সবুজ উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চীনের শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার পরেই চীনকে বেছে নেওয়ায় একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। একইসঙ্গে ঢাকা বেইজিংকে জানিয়ে দিয়েছে যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো সহযোগিতায় চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবেই থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর থেকে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ঋণ বা প্রকল্প ঘোষণা না পেলেও রাজনৈতিক আস্থা, কৌশলগত সহযোগিতা, তিস্তা প্রকল্পে সমর্থন, নতুন উন্নয়ন উদ্যোগে অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও সংযোগের সম্ভাবনার মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন পেয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফরের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে স্বাক্ষরিত সমঝোতাগুলোর বাস্তবায়নের ওপর।
গতকাল শনিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ৮টি সমঝোতা ও ৩টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মোংলা বন্দর এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য বিশেষ ইপিজেড নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একইসঙ্গে তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। এসময় তিনি জানান, কুনমিং থেকে বাংলাদেশে সরাসরি যোগাযোগের জন্য চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোর প্রস্তাব করেছে বেইজিং। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরেও ‘বাংলাদেশ ফাস্ট নীতি’র বড় ধরনের সাফল্য দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন ড. খলিলুর রহমান।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে বিশেষ গতি পাবে। তারেক রহমানের চীন সফর গভীরতর দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, চীন আমাদের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাবে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়বে। এর ফলে দুই দেশই লাভবান হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

 

 

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা