শ্রীমঙ্গল ফিরে জাহাঙ্গীর খান বাবু ও মৌলভীবাজার প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম: ভোর সাড়ে ৫টা। মেঘের কুয়াশার চাদর ভেঙে শ্রীমঙ্গলের আকাশে যখন সূর্যের প্রথম আলো উঁকি দেয়, তখন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায় পর্যটকদের। কিন্তু এই চোখজুড়ানো সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা শোষণ, বঞ্চনা আর কান্নার ইতিহাস। জেমস ফিনলে কোম্পানি লিমিটেডের ভাড়াউড়া, খাইছড়া, জাগছড়া কিংবা পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ী চা বাগানের হাজার হাজার শ্রমিকের ভাগ্য বদলায় না। যুগ যুগ ধরে তারা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বিনিময়ে যা পাচ্ছেন তা কেবলই বেঁচে থাকার ন্যূনতম সংগ্রাম। মাঠপর্যায়ে চা শ্রমিকদের সাথে সরাসরি কথা বলে উঠে এসেছে তাদের জীবনের নানামুখী সংকট ও বঞ্চনার এক্সক্লুসিভ চিত্র। নামমাত্র দৈনিক মজুরি, বাসস্থানের তীব্র সংকট, দায়সারা চিকিৎসা ব্যবস্থা আর উৎসব-সংস্কৃতির আড়ালে থাকা চরম অর্থনৈতিক দৈন্যদশা নিয়েই পুরুষানুক্রমে বেঁচে আছেন এই অঞ্চলের চা শ্রমিকেরা।
কাগজে-কলমে চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত থাকলেও এর পেছনে রয়েছে ‘কেজি’র এক নির্মম শর্ত। বাংলাদেশীয় চা সংসদ (বিসিএস) নির্ধারিত ২০২৫-২০২৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মূল মজুরি ১৮৭ টাকা। কিন্তু এই ১৮৭ টাকা পকেটে পুরতে একজন শ্রমিককে পার করতে হয় অগ্নিপরীক্ষা। ভাড়াউড়া চা বাগানের নারী শ্রমিক জয় মনি জানান, কাগজে-কলমে ১৮৭ টাকা বলা হলেও এর পেছনে রয়েছে ‘কেজি’র নির্মম শর্ত। প্রতিদিন ২২ কেজি চা পাতা তুলতে পারলে তবেই মেলে এই পুরো টাকা। পাতা কম হলে মজুরিও জ্যামিতিক হারে কমে যায়। জয় মনি ক্ষোভের সাথে বলেন, কম পাতা তোলার কারণে কোনো কোনো দিন ১০০ টাকাও পেয়েছি। অথচ এই কম টাকা থেকেও আবার প্রভিডেন্ট ফান্ডের চাঁদা কেটে নেওয়া হয়। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। একই বাগানের ৩০ বছর বয়সী নারী শ্রমিক রাজ কুমারী জানান, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত (দুপুরে ১ ঘণ্টা বিরতিসহ) হাড়ভাঙা খাটুনির পর তার দৈনিক হাজিরা আসে মাত্র ১৮২ থেকে ১৮৭ টাকা। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে একই বাগানে কাজ করেও ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি তার। এই বিষয়ে ফুলবাড়ী চা বাগানের টিলা করণিক (টিলা বাবু) জিয়াউল ইসলাম বাস্তব চিত্রটি নিশ্চিত করে বলেন, বাংলাদেশীয় চা সংসদ (বিসিএস) নির্ধারিত ২৫-২৬ সালের জন্য এই বেতন ১৮৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শ্রমিকদের দৈনিক ২২ কেজি চা পাতা উত্তোলন করতে হয়। ২২ কেজির উপরে যদি কোনো শ্রমিক বেশি পাতা তুলতে পারেন, তবে প্রতি কেজি অতিরিক্ত পাতার জন্য ৫ টাকা করে বোনাস বা বাড়তি মজুরি দেওয়া হয়। তবে শ্রমিকদের দাবি, খরা মৌসুমে বা পাতা কম থাকার দিনে ২২ কেজির টার্গেট পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে জরিমানা বা কম মজুরি পাওয়াটাই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চা বাগানগুলোর আরেকটি আত্মঘাতী নিয়মের নাম ‘এক পরিবারে একজন’ নীতি। খাইছড়া চা বাগানের বাধ্যতামুলক নিয়ম অনুযায়ী এক পরিবার থেকে কেবল একজনই স্থায়ী বা পার্মানেন্ট শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারবেন। এই নিয়মের কারণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় স্টেশনারি দোকানদার নেপাল দুধ বংশী। তার বাবা শ্রীকুমার দুধ বংশী একসময় এখানে স্থায়ী কাজ করতেন। নিয়ম অনুযায়ী বাবার অবসরের পর এখন ছোট ভাই দিপাল দুধ বংশী দৈনিক মাত্র ১৭০ থেকে ১৮৭ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। নেপাল বলেন, পাঁচ ভাই এক বোনের পরিবারে মাত্র একজন ১৭০-১৮৭ টাকা রোজে কাজ করে। এই সামান্য টাকায় স্বামী-স্ত্রী আর দুই বাচ্চা নিয়ে কীভাবে চলা যায়? মালিকপক্ষ বা সরকারের সাথে কথা বলার সামর্থ্য আমাদের মতো সাধারণ শ্রমিকের নেই। এই কঠোর নিয়মের কারণে বাগানগুলোতে হু হু করে বাড়ছে বেকারত্ব। স্থায়ী কাজ না পেয়ে তরুণ ও যুবকদের বড় অংশ ‘ঠিকায়’ বা ক্যাজুয়াল হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। গীতা (৪০) নামের এক নারী শ্রমিকের দুই ছেলে এই বাগানেই ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কাজের তারতম্য অনুযায়ী একজন পান ১১০ টাকা এবং অন্যজন ১৫০ টাকা মজুরি। ঠিকায় কাজ করায় তারা কোম্পানির কোনো রেশন সুবিধাও পান না। গীতা জানান, তার ৬৫ বছর বয়সী স্বামী বাচন দুষার বংশগতভাবে চা শ্রমিক হলেও আজ ৪২ বছর ধরে বেকার। কোনো সরকারি ভাতাও তাদের জোটে না; শেষ বয়সে এসে বস্তির মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে তাদের সংসার চালাতে হচ্ছে।
বছরের পর বছর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর ধরে চা বাগানের জন্য রক্ত জল করলেও শ্রমিকদের মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো ভূমি নেই। বাগান কর্তৃপক্ষ যে সামান্য কোয়ার্টার বা লাইন ঘর দেয়, তা এখন একেকটি নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। ভাড়াউড়া বাগানের ১০ বছরের অভিজ্ঞ কর্মী ঊষা রানী হাজরা জানান তাদের আবাসন সংকটের ভয়াবহ চিত্র। চার মেয়ে, দুই ছেলে ও অবসরে যাওয়া ফ্যাক্টরি শ্রমিক স্বামীকে নিয়ে তাদের সংসার। এক ছেলে আবার শারীরিক প্রতিবন্ধী। ঊষা রানী বলেন, যেখানে একটা পরিবার থাকা কষ্টকর, সেখানে এক ঘরে চারটা ফ্যামিলি একসাথে বসবাস করি। শুধু ঘরটুকুই আছে, কোনো উঠান বা বারান্দা নেই। বড় ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক ঘরে থাকা কতটা লজ্জার ও কষ্টের তা শুধু আমরাই জানি। সরকারের কাছে দাবি, আমাদের বসবাসের জমির ব্যবস্থা যেন করা হয়। চা বাগানের জমি কোম্পানির লিজ নেওয়া হওয়ায় শ্রমিকেরা সেখানে স্থায়ী কোনো স্থাপনা করতে পারেন না। ফলে এক একটি ভাঙা ঘরে গাদাগাদি করে বাস করছে ৪টি পর্যন্ত পরিবার।
চা শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ করে ‘শ্রীমঙ্গল লেবার হাউস’ নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের সভাপতি বিজয় হাজরা। অনুসন্ধানকালে জানা গেছে, এই সংগঠনটি প্রতি সপ্তাহে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ড (চঋ) বাবদ ১০০ টাকা করে কেটে রাখছে, যা শ্রমিকদের আপদকালীন সঞ্চয় হিসেবে জমা থাকে। তবে সাধারণ শ্রমিকদের অভিযোগ, এই ফান্ডের টাকা জমা হলেও তা থেকে ঋণ পাওয়া বা জরুরি প্রয়োজনে টাকা তোলা অত্যন্ত জটিল। তাছাড়া মজুরি যেখানে ১৮৭ টাকা, সেখান থেকে প্রতি সপ্তাহে ১০০ টাকা কেটে নেওয়া তাদের দৈনিক সংসারে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করে।
সাধারণ পাতা-তোলা শ্রমিকদের তুলনায় বাগানের লেবার সর্দার ও মেকানিকদের অবস্থা কিছুটা ভিন্ন হলেও তা মোটেও বিলাসী নয়। ভাড়াউড়া বাগানের লেবার সর্দার উজ্জ্বল হাজরা জানান, ২৪ বছর ধরে কাজ করে তিনি ৩০০ টাকা দৈনিক মজুরিতে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করেন। বাগানের ১০ জন সর্দারের বেতনই এক। শ্রমিকদের মতো তারাও সপ্তাহে সাড়ে তিন কেজি আটা রেশন পান। তবে তার আক্ষেপ, এই অল্প টাকায় বাচ্চাদের ভালোভাবে শিক্ষা দিতে পারি না, পরিবারকে ভালো মাছ-মাংস খাওয়াতে পারি না। সর্দার নামেই, কামে সেই গরিবই। অন্যদিকে, ৫ বছর ধরে মেশিন ফিডার হিসেবে কর্মরত বিপ্লব আচার্য (৫৬) মাসিক ১৪,২০০ টাকা বেতন পান। কোনো রেশন সুবিধা না পেলেও আগের ক্যাজুয়াল অবস্থার চেয়ে বর্তমান বেতনে তিনি কিছুটা সন্তুষ্ট। জাগছড়া চা বাগানের ৮ নম্বর সেকশনের গ্রিন টি কাঁচা পাতার সর্দার সুভাষ কানু (৫০) ২০০৯ সন থেকে মাসিক ৯,০০০ টাকা চুক্তিতে কাজ করছেন। বাগান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ধানের জমি নেওয়ার কারণে তার রেশনের পুরোটাই কেটে নেওয়া হয়। মাসে ৫ মণ লাকড়ি আর এই বেতন দিয়েই চলে তার সংসার। তার অধীনে প্রতিদিন ৭৫ জন নারী-পুরুষ সমান মজুরিতে কাজ করেন। সুভাষ কানুর মতে, লেবার আইন অনুযায়ী তিনি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন এবং তার কোনো বড় অভিযোগ নেই।
ভাড়াউড়া চা বাগানের ফ্যাক্টরি ইনচার্জ (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) দাবি করেছেন যে, ফ্যাক্টরি এবং বাগান উভয় জায়গার শ্রমিকদেরই ৮ ঘণ্টা ডিউটির জন্য ১৮৭ টাকা করে দেওয়া হয়। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, এই সামান্য মজুরি দিয়ে বর্তমান বাজারের আকাশছোঁয়া মূল্যের সাথে তাল মিলিয়ে চলা অসম্ভব। পেটের দায়ে অল্প বয়সেই পড়ালেখা ছেড়ে শিশুরা আবার নামছে চা পাতার ঝুড়ি কাঁধে তুলে নিতে। শ্রীমঞ্চলের সবুজ চা বাগানের পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে এই হাজারো শ্রমিকের চাপা কান্না আর বেঁচে থাকার তীব্র আকূতি।
