বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি কমিটির সদস্যের অডিও রেকর্ড ফাঁস

বিআইডব্লিউটিএ’র জোড়া তদন্ত প্রতিবেদন জালিয়াতি

বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি কমিটির সদস্যের অডিও রেকর্ড ফাঁস

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-র সাবেক চেয়ারম্যানের ভগ্নিপতিকে বাঁচাতে একই তারিখে দুটি ভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনায় এবার ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কায় একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এক সপ্তাহ আগে দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে এই প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশের পর, অনুসন্ধানে নেমে মিলেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য ও উপ-পরিচালক আইনুল হকের একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে, যেখানে তিনি স্বীকার করেছেন যে, কমিটির আহবায়কের নির্দেশেই তিনি প্রতিবেদনে স্বাক্ষর ও রদবদল করেছেন। অন্যদিকে, কমিটির আহবায়ক ও অন্য সদস্যরা এখন এই জালিয়াতির দায় এড়াতে একে অপরের কোর্টে বল ঠেলছেন।

সরাসরি কার্যালয়ে গিয়েও মেলেনি সদুত্তর, দায় এড়ানোর চেষ্টাঃ
টেলিফোনে সাড়া না পেয়ে ঘটনার সত্যতা ও ফলোআপ নিউজ করার লক্ষ্যে এই প্রতিবেদক সরাসরি বিআইডব্লিউটিএ’র মতিঝিল কার্যালয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যদের মুখোমুখি হন। তবে জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও কমিটির সদস্যদের মধ্যে দায় এড়ানোর মরিয়া চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
কমিটির অন্যতম সদস্য রফিকুল ইসলাম (উপ-পরিচালক, হিসাব) সরাসরি সাংবাদিকদের এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আপনি কমিটির আহবায়ক ও প্রধান প্রকৌশলী (মেরিন) রবিউল ইসলামের সাথে কথা বলেন।”
ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড ও মুখ খোলার হিড়িকঃ
সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য মিলেছে কমিটির আরেক সদস্য আইনুল হকের বক্তব্যে। মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে বিশেষ কিছু বলতে পারব না। আমাকে কমিটির আহবায়ক যেভাবে লিখতে বলেছেন, আমি সেভাবে লিখে দিয়েছি। আপনি কমিটির আহবায়ক রবিউল ইসলামের সাথে কথা বলেন।”
শুধু মুখের কথাই নয়, আইনুল হকের একটি অডিও রেকর্ডও এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে তিনি অপর প্রান্তের এক ব্যক্তির সাথে আলাপকালে স্পষ্টভাবে বলছেন যে, চেয়ারম্যান ও তদন্ত কমিটির প্রধানের চাপ ও নির্দেশেই তিনি এমনটি (প্রতিবেদন পরিবর্তন) করতে বাধ্য হয়েছেন।
“দুটি রিপোর্ট পেলেন কিভাবে জানি না”—কমিটি আহবায়কঃ
সদস্যদের এমন গুরুতর অভিযোগ ও অডিও ফাঁসের পর তদন্ত কমিটির আহবায়ক, প্রধান প্রকৌশলী (মেরিন) রবিউল ইসলামের মুখোমুখি হলে তিনি চরম অস্বস্তিতে পড়েন। জালিয়াতির বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করার চেষ্টা করে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “আমি একটি রিপোর্ট দিয়েছি। আপনারা কিভাবে দুটি রিপোর্ট পেলেন তা আমার জানা নেই।”
অথবা একই তারিখে, একই স্মারকে দুটি ভিন্ন রিপোর্টের অস্তিত্ব এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার কপি থাকার বিষয়ে কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
নেপথ্যে সেই ‘অদৃশ্য হাত’ ও দুই সৎ কর্মকর্তার ভবিষ্যৎঃ
উল্লেখ্য, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জমা পড়া প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে দুই নিরপরাধ কর্মকর্তা—অতিরিক্ত পরিচালক (মেরিন) মোঃ আব্দুর রহিম এবং উপ-পরিচালক মোঃ ওবায়দুল করিম খানকে নির্দোষ উল্লেখ করে মূল অপরাধী দুই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু সাবেক চেয়ারম্যান কমোডর আরিফ আহমেদ মোস্তফার ভগ্নিপতি ও ঠিকাদার আবু ইউসুফ বীনাকে বাঁচাতে এক ‘অদৃশ্য হাতের’ ছোঁয়ায় সেই রাতেই গায়েব হয়ে যায় মূল প্রতিবেদন।
পরিবর্তিত দ্বিতীয় প্রতিবেদনে দুই সৎ কর্মকর্তাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে বিভাগীয় শাস্তির খড়্গ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির সদস্যদের বর্তমান লুকোচুরি এবং ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড প্রমাণ করে যে, ওপর মহলের নির্দেশে এই জালিয়াতি পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছিল। এই অডিও রেকর্ড ও কমিটির সদস্যদের স্ববিরোধী বক্তব্যই প্রমাণ করে দুই কর্মকর্তা নির্দোষ। অবিলম্বে এই জালিয়াতির পুর্নতদন্ত করে দোষী ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা