বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ পড়ার টেবিল ছেড়ে অপরাধে: পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

পড়ার টেবিল ছেড়ে অপরাধে: পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

শ্রীমঙ্গল থেকে শাহাব উদ্দিন আহমদ: সমগ্র পৃথিবীর কাছে এক নামে পরিচিত দুই পাতা একটি কুঁড়ির দেশ, চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল। ভোরের কুয়াশা যেখানে চা-বাগানের সবুজ ঢেউয়ে লুটিয়ে পড়ে, লাউয়াছড়ার বনভূমি যেখানে পাখির ডাকে জেগে ওঠে, বাইক্কা বিলের জলে যেখানে অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত হয় সকাল—সেই নিসর্গের শহরেই এখন নিঃশব্দে বাসা বেঁধেছে এক অন্ধকার। এই মাটির সন্তানরাই আজ ভুলে যাচ্ছে চায়ের কুঁড়ির মতো কোমল কৈশোরের কথা। ১০ থেকে ২০ বছর বয়সী একদল কিশোর-তরুণ মাদক সেবন, ইভটিজিং, গভীর রাতে মোটরসাইকেলের উচ্চ শব্দে দাপিয়ে বেড়ানো এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে শ্রীমঙ্গলেই এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। যে বয়সে তাদের থাকার কথা পড়ার টেবিলে, বইয়ের পাতায়, সেই বয়সেই লেখাপড়া ছেড়ে একের পর এক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এই কিশোররা।

পর্যটকদের কাছে শ্রীমঙ্গলের পরিচয় চা-বাগান, রাবার বাগান আর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মোড়ানো এক প্রশান্তির নাম। অথচ সেই প্রশান্তির গায়েই এখন কালো ছায়া ফেলছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। পর্যটন এলাকাগুলোর আশপাশে জটলা পাকিয়ে থাকা, উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল ছুটিয়ে ভয় দেখানো এবং ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে অনেক পর্যটক বিরক্তি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ যে শহরে দুদণ্ড শান্তি খুঁজতে আসেন, সেই শহরেরই অলিগলিতে আজ তাদের সইতে হচ্ছে অস্বস্তি আর আতঙ্ক। স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়মতো লাগাম টানা না গেলে এই প্রবণতা শ্রীমঙ্গলের পর্যটন-ভাবমূর্তিতেও গভীর আঘাত হানতে পারে।

অসামাজিক সিনেমা, অশ্লীলতা ও মাদকতা পুরো যুব সমাজকে নষ্ট করে দিচ্ছে বলে অভিভাবকদের অনেকে মনে করছেন। সারা রাত মোবাইল ফোন নিয়ে পড়ে থাকা, অনলাইনে জুয়া খেলা আর রাস্তায় রাস্তায় আড্ডাবাজি করে অনেক রাত করে বাসায় ফেরা—এরপর দুপুর বা বিকেলে ঘুম থেকে উঠে আবার সেই একই আড্ডায় জড়িয়ে পড়া, এভাবেই কাটছে এই কিশোরদের দিন। এদের অনেককে আবার এলাকার তথাকথিত কিছু ‘বড় ভাই’ নিজেদের বলয় ভারী করার জন্য প্রশ্রয় দিয়ে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোনো ঝামেলা হলেই সেই বড় ভাইদের ইশারায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপে নেমে পড়ে এসব কিশোর। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়াতেই এসব কিশোর গ্যাং আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে, ফলে অভিযোগ থাকলেও অনেক সময় প্রতিকার মেলে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবার এই প্রতিবেদককে জানায়, বখাটে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে করতে একপর্যায়ে তাদের সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, এখন তাকে আর কোনোভাবেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। শুধু এই পরিবার নয়, এলাকার একাধিক পরিবার সন্তানকে সঠিক পথে ফেরাতে গিয়ে উল্টো তারই হাতে অপমানিত হয়েছেন, তবু সমাজে মুখ দেখানোর ভয়ে তা প্রকাশ না করে নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন। বাবা-মায়ের সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক, জোরজবরদস্তি করে মোটরসাইকেল ও দামি মোবাইল ফোন আদায় করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। আবার কিছু পরিবার সন্তান ‘নেতা’ বা এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে উঠলে তা নিয়ে গর্ববোধ করেন, তাদের ধারণা—ছেলে মানুষের কাছে ভয়ের পাত্র হয়ে উঠলে পরিবার নিরাপদ থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদের এই নিয়ন্ত্রণহীনতা, সহজলভ্য অর্থ এবং ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহার কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে মৌলভীবাজার জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটরিয়ামে জেলা পুলিশের আয়োজনে ‘নাগরিকবৃন্দের সাথে মাদক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মো. জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে বিজিবির পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পুলিশের অধীনে সরাসরি ও সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট’ উইং থাকা প্রয়োজন। মাদকাসক্ত তরুণদের ক্ষেত্রে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের দ্রুত শনাক্ত করে ডিটেনশন সেন্টার বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর তাগিদ দেন তিনি, যাতে সমাজ ও পরিবারের ক্ষতি করার আগেই তারা নিরাময়ের সুযোগ পায়। এলাকায় খেলার মাঠের অভাব ও তার সঙ্গে মাদক এবং অপরাধপ্রবণতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় তরুণরা ফেসবুক-আসক্তিতে ঝুঁকে পড়ছে, আর অলস মস্তিষ্কই হয়ে উঠছে অন্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি ইউনিয়নে মানসম্মত খেলার মাঠ নিশ্চিত হলে তরুণদের এই আসক্তি ও অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি। সীমান্ত দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফেনসিডিল পাচারের বিষয়েও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সভাপতির বক্তব্যে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মো. জিল্লুর রহমান মাদক ব্যবসায়ী বা সেবনকারী—কারও পক্ষ থেকেই কোনো তদবির বরদাশত করা হবে না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন। কিশোর গ্যাং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় গ্যাং কালচার বা অপরাধ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সেখানে অবিলম্বে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে। অপরাধী স্থানীয় হোক বা বহিরাগত, তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা যাচাই করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

শুধু অভিযান আর গ্রেপ্তার দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের প্রস্তাব, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীদের সমন্বয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় প্রথমে ওয়ার্ড বা মহল্লাভিত্তিক জরিপ চালিয়ে চিহ্নিত করতে হবে কোন কোন কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্টতায় জড়িয়ে পড়েছে বা ঝুঁকিতে রয়েছে। এরপর তাদের প্রত্যেকের পরিবারসহ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করে ধাপে ধাপে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। মাদকাসক্ত কিশোরদের জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও নিরাময় কেন্দ্রের ব্যবস্থা, খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু করে অবসর সময়কে ইতিবাচক পথে ঘুরিয়ে দেওয়া, আর যারা দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে তাদের জন্য বিশেষ ব্রিজিং বা প্রস্তুতিমূলক ক্লাসের ব্যবস্থা করে ধীরে ধীরে পুরনো ক্লাসে বা কারিগরি-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিচ্ছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পুলিশ, সমাজকর্মী ও মনোবিজ্ঞানীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সেশন আয়োজন এবং যেসব ‘বড় ভাই’ পরিচয়ে কিশোরদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা নেওয়া গেলে কিশোরদের পক্ষে সেই বলয় থেকে বেরিয়ে আসাও সহজ হবে বলে মত দিয়েছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে সন্তানের সময় ও চাহিদার প্রতি সচেতন দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা, যাতে অভাব বা অবহেলার সুযোগে কোনো কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে না পড়ে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু পুলিশি অভিযান বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে একযোগে সম্পৃক্ত না করা গেলে, আর কিশোর গ্যাংকে যারা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে, পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলের এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা