রিয়াজ উদ্দিন, কক্সবাজার : কক্সবাজারের পর্যটন জোনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। শহরের কলাতলী সড়কের সুগন্ধা বিচে প্রবেশমুখের ডান পাশে ১০ একরেরও বেশি সরকারি জমি শনিবার মধ্যরাতে টিন ও বাঁশ দিয়ে ঘেরাও করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এ জমি দখলের চেষ্টা করছে। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েকশো কোটি টাকা বলে স্থানীয়দের দাবি।
শনিবার (১৫ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, সুগন্ধা বিচের প্রবেশমুখের পাশে সরকারি জমির বড় একটি অংশ টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ঘেরাওয়ের আগে সেখানে দুই শতাধিক ভাসমান দোকান ছিল বলে জানান হকাররা। রাতের আঁধারে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক এসে প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে জমিটি ঘেরাও করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ সময় ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করছিল বলেও দাবি করা হয়।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঘেরাওয়ের বিষয়টি হকার ও স্থানীয়দের নজরে এলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হকাররা প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ টিনের বেড়া লাঠিসোটা দিয়ে ভাঙচুর করেন। তবে ওই সময় কথিত দখলদারদের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকারদের অভিযোগ, সরকারি জমি দখলের ঘটনা সুগন্ধা এলাকায় নতুন নয়। এর আগে নিলিমা রিসোর্টের পূর্ব পাশে হাড়ি রেস্টুরেন্টের দক্ষিণে প্রায় ৫০ শতক সরকারি জমি দখলের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট ওই জমি দখলের চেষ্টা হলে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের যৌথ অভিযানে ঘেরাও উচ্ছেদ করা হয়। পরে আবারও ওই জায়গা দখলের অভিযোগ ওঠে।
সরকারি জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় যুবদল নেতা আজিজুল হক সোহেল এক ফেসবুক পোস্টে সুগন্ধা পয়েন্টের সরকারি জমি দখল হয়ে যাচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বাতিল হয়েছিল ৫৯ প্লটের ইজারা
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন প্রায় ১৩০ একর সরকারি খাসজমিতে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলা হয়। সেখানে ৮৭টি প্লট তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ৯৯ বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ না করায় সংসদীয় কমিটি এবং ভূমি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় কমিটির সুপারিশের পর ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি ৫৯টি প্লটের ইজারা বাতিল করে জেলা প্রশাসন।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে বাতিল হওয়া এসব জমি সরকারি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে এসব জমিতে নতুন করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ কিংবা ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত বছরও সরকারি জমি দখলের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন। আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ে দখলে থাকা প্রায় ২ দশমিক ৩০ একর জমি উচ্ছেদ করে দখলমুক্ত করা হয়। পরে সেখানে সরকারি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।
চার ঘণ্টার আলটিমেটাম প্রশাসনের
এদিকে সুগন্ধায় সরকারি জমি দখলের বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসার পর অবৈধ স্থাপনা ও টিনের বেড়া সরিয়ে নিতে চার ঘণ্টার সময় দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর হোসেন সায়েম বলেন, সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখলের ঘটনায় জড়িতদের একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই জমির মালিকানা বা ইজারার পক্ষে বৈধ কোনো নথি থাকলে তা জেলা প্রশাসক অথবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে উপস্থাপনের জন্য বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রশাসন কাউকে সরকারি জমি দখল বা ঘেরাও করার অনুমতি দেয়নি। শনিবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অবৈধ অবকাঠামো ও টিনের বেড়া সরিয়ে নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে স্থাপনা সরিয়ে নিতে সম্মতও হয়েছিলেন।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেড়া অপসারণ না করে সরকারি জমি দখল বজায় রাখার চেষ্টা করা হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
পর্যটন নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সরকারি জমি দখলের এমন অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, দ্রুত অভিযান চালিয়ে সরকারি জমি দখলমুক্ত করার পাশাপাশি এর নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
