শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ কক্সবাজারকে আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান

কক্সবাজারকে আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান

রিয়াজ উদ্দিন, কক্সবাজার : বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আধুনিক পর্যটন নগরী। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরো, যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি ও পানামা সিটি, স্পেনের বার্সেলোনা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান এর বড় উদাহরণ। এসব নগরীর আদলে কক্সবাজারকে এশিয়ার অন্যতম আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
এ লক্ষ্যে কক্সবাজারের জন্য নতুন করে ২০ বছর মেয়াদি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ চলছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় মাটি পরীক্ষা করেছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—কক্সডিএ। তবে সেই গবেষণার বিস্তারিত প্রতিবেদন এখনো হাতে পায়নি কর্তৃপক্ষ।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পর্যটন খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানো হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজার ও কুয়াকাটা অঞ্চলে বালু, পলি ও নরম সামুদ্রিক মাটির আধিক্য রয়েছে। ফলে ৩০ তলা বা তার বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণে শক্ত ভারবহনক্ষম স্তর কিংবা শিলা পর্যন্ত গভীর পাইল ফাউন্ডেশনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ সম্ভব হলেও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ ও নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ২৩ জুলাই সচিবালয়ে কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়নের ক্ষেত্রে ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিদ্যমান বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও কক্সবাজারকে পর্যটন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
কক্সবাজারের ভূ-প্রকৃতি, বন, পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এলাকাভেদে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে সুউচ্চ ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০১১ থেকে ২০৩১ মেয়াদের প্রথম মাস্টারপ্ল্যানে এসব বিধিনিষেধ রাখা হয়। ২০১৬ সালে কক্সডিএ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও আগের মাস্টারপ্ল্যানের শর্ত অনুসরণ করেই নগর উন্নয়নের কাজ চলেছে।
তবে এসব বিধিনিষেধের মধ্যেই বিগত সময়ে কক্সবাজারে বহু হোটেল ও স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিবেশ ও বন আইনও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থাপনা অপসারণে কক্সডিএ উদ্যোগ নিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
পরে পুরোনো মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন করে নতুন ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবুল বাকের মো. তৌহিদ বলেন, নতুন মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শেষ করতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগবে।
কক্সডিএর উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ মো. তানভীর হাসান রেজাউল বলেন, ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। এবার সৈকতসহ বিভিন্ন এলাকা জোনিং করে মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে। বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও বিজ্ঞানসম্মত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ খান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি মাটির প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। তাই মাটি পরীক্ষা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

তবে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের উপযোগিতা পাওয়া গেলেও উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা—ইসিএ ঘোষণা করে সরকার। এসব এলাকায় ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন, দূষণকারী শিল্প স্থাপন, আবাসস্থল ধ্বংস, বন ও গাছপালা কাটা এবং বন্যপ্রাণী শিকারসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সীমিত ভূমির দেশে পরিকল্পিত বহুতল উন্নয়ন প্রয়োজন। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর সমন্বয়ে আধুনিক পর্যটন নগরী গড়ে তোলা হবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে কক্সবাজারকে অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী  সালাহউদ্দিন  আহমদ বলেন, কক্সবাজারকে পর্যটন ও বাণিজ্যিককেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকা, মেরিন ড্রাইভ ও উপকূলীয় এলাকার বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র, নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করাই হবে নতুন মাস্টারপ্ল্যানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা