বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: সুন্দরবন উপকূলের নদ-নদী এবং বঙ্গোপসাগরে ভরা মৌসুমেও কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা মিলছে না। নাব্য সংকট, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় হতাশ হয়ে খালি ট্রলার নিয়ে ফিরছেন জেলেরা। ইলিশ না পাওয়ার অন্যতম মূল কারণ নাব্য সংকট ও ডুবোচর। পলি জমে নদ-নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় এবং ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া এবং সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ও লবণের মাত্রা বদলে যাওয়ায় ডিম ছাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে বিষ দিয়ে ও কারেন্ট জাল ব্যবহার করে জাটকা এবং মা ইলিশ শিকারের কারণে প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গভীর সমুদ্র থেকে উপকূলের কাছাকাছি বা ভেতরের নদ-নদীতে ইলিশের প্রবেশ কমে গেছে। এতে একদিকে এলাকার জনসাধারণ রূপালী ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছেন। অন্যদিকে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন উপজেলার হাজারো জেলে পরিবার।
সাধারণত অক্টোবরে সুন্দরবন উপকূলের নদ-নদী এবং ইলিশের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত বঙ্গোপসাগরে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়ার কথা থাকলেও এ বছর তা পাওয়া যাচ্ছে না। জেলেরা বলছেন, চলতি মৌসুমে মহাজন ও আড়ৎদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে ইলিশ শিকারে নদ-নদীতে নামছে জেলেরা। কিন্তু মিলছে না ইলিশ। মাছ না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত উপকূলের মৎসজীবীরা।
ইলিশ মৌসুমের পাঁচ মাস পার হলেও এ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখেনি কোনো জেলে বা মহাজন। সাধারণত জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস জেলেদের কাক্সিক্ষত সময়। বর্ষার এই তিন মাসের দিকে তাকিয়ে জেলেরা সারাবছর প্রহর গুনে। প্রতিবছর এ সময় নদী ও সমুদ্রে প্রচুর ইলিশের দেখা মেলে। আর এই ইলিশ বিক্রির অর্থ দিয়েই চলে জেলেদের সারা বছরের সংসার। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভরা মৌসুমেও সুন্দরবন এলাকায় রূপালী ইলিশের বড় আকাল চলছে। জেলেরা জীবন বাজি রেখে ইলিশের প্রধান উৎস বঙ্গোপসাগরের গভীরে গিয়ে পর্যাপ্ত ইলিশ পাচ্ছে না।
গবেষকরা বলছেন, নদীর মোহনা ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নদ-নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গভীর সমুদ্রে সরে যাচ্ছে ইলিশ। এ অবস্থায় ইলিশ আহরণ বাড়াতে নদীর মোহনা খননের পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে ইলিশ শিকারের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলছেন গবেষকরা। উপকূল থেকে ইলিশ মাছ গভীর সমুদ্রে সরে গেলেও ইলিশের ঝাঁকের খোঁজে গভীর সমুদ্রে যেতে পারছেন না জেলেরা। এর কারণ হিসেবে কারিগরি সক্ষমতা এবং সরকারের উদ্যোগের অভাবকে দায়ী করছেন তারা।
চলতি মৌসুমে ইলিশ শিকারের আশায় জাল, নৌকা ও ট্রলার নিয়ে দল বেঁধে নদীতে ছুটছেন জেলেরা। ভোর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত নদী চষে বেড়ালেও তাদের জালে মিলছেনা কাঙ্খিত ইলিশ। দাকোপের জেলে জাকির হোসেন বলেন, ইলিশের ভরা মৌসুমে প্রতিদিন আমরা ৪-৫ জন নদীতে যাই। গড়ে তিন চারটা ইলিশ পাই। যার মূল্য এক হাজার টাকার বেশি না কিন্তু ট্রলার ও তেলের খরচের পর তিন-চারশ টাকা থাকে। যা দিয়ে পরিবারের বাজারই হয়না।
সুন্দরবনের মৎস্য আহরনের অভয়ারণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ঢাকী, ভদ্রা, শিবসা, কাজীবাছা, মাঙ্গা, পশুর ও ঝপঝপিয়া নদী। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকার প্রায় হাজারো জেলে পরিবার এই পেশার উপর নির্ভরশীল। এসব জেলেরা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ ও মহাজনের দাদন নিয়ে জাল নৌকা কিনে অনেকে নদীতে নেমেছেন। কিন্তু দিনরাত নদীতে জাল ফেলেও ইলিশ না পেয়ে তারা নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। এমনকি ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না এসব জেলেরা। যে কারনে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারেও ক্রেতাদের সাথে ইলিশের দেখা মিলছে খুব কম। মাঝে মধ্যে দুই একজন জেলের জালে দুই একটি মাছ ধরা পড়লেও বাজারে তার দাম অনেক বেশি। যা সাধারন মানুষ কিনে খেতে পারছেন না।
এদিকে এনজিও ঋনের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় তাদের সাথে প্রায়ই চেকের মামলায় জড়িয়ে পড়ছেন জেলেরা। মাঝে মধ্যে আবার আত্মগোপন করেও থাকতে হচ্ছে অনেক জেলেকে। অন্য কোন আয়ের উৎস্য না থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন উপকুলীয় উপজেলার এসকল জেলে পরিবারগুলো। জেলেদের পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই অনাহারে অর্ধহারে দিন কাটাছেন। আবার জেলেদের সরকারের পক্ষ থেকে যে ভাতা দেয়া হচ্ছে তা প্রকৃত জেলেরা পাচ্ছে না। আর যে সাহায্য দেয়া হচ্ছে তাও প্রয়োজনের তুলনায় ১০শতাংশ। জেলেরা অর্থ কষ্টে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আবার সাধারন মানুষও রূপালী ইলিশ মাছের স্বাদ প্রায় ভুলতে বসেছেন।
