এন.এম হামিদী বাবু নীলফামারীঃ শ্রেণিকক্ষ সংকট, নামমাত্র শিক্ষার্থী আর কাগজ-কলমে বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থ আত্মসাৎ, বিশুদ্ধ পানির চরম সংকটে, টয়লেটসহ নানা অনিয়মের দৃশ্য দেখা দিয়েছে নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাঁপ ইউনিয়নের শালমারা গোড়ক পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা রায়হানা রাব্বির বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা।
কাগজে-কলমে বিপুল শিক্ষার্থী দেখানো হলেও সরেজমিনে উপস্থিতি দেখা যায় করুণ। প্রতিদিন গড়ে প্রথম শ্রেণিতে ৫-৬ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩-৪ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৩-৪ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৩-৪ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে মাত্র ১ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশ নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই ভুয়া তালিকার ওপর ভিত্তি করেই বছরের পর বছর সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও বরাদ্দ হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রধান শিক্ষিকা। এমনকি শিক্ষা অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে তিনি চতুরতার সাথে পার্শ্ববর্তী ব্র্যাক স্কুল থেকে শিক্ষার্থী এনে শ্রেণিকক্ষ ভর্তি দেখিয়ে জালিয়াতি করার অভিযোগ রয়েছে।
পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় বাধ্য হয়ে একই ঘরে একসাথে দুটি শ্রেণির পাঠদান চালানো হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিকের কোমলমতি শিশুদের জন্য নেই কোনো পৃথক কক্ষ কিংবা খেলনা সামগ্রী। বিশুদ্ধ পানির চরম সংকটে ভুগছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের দুটি টিউবওয়েলই দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। ট্যাপের পানির ট্যাংকিতে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও পোকামাকড়। তীব্র তৃষ্ণায় কোমলমতি শিশুরা বাধ্য হয়ে পাশের বাড়ি বা দোকান থেকে পানি পান করে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ব্যবহারের জন্য কোনো কার্যকর ওয়াশরুম বা টয়লেট নেই। যা আছে, তাও ব্যবহারের অনুপযোগী। ফলে শিশু শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষকরা পর্যন্ত প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ছোটেন পার্শ্ববর্তী বাঁশঝাড় কিংবা আশপাশের বাসাবাড়িতে।
এলাকাবাসী ও বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের অভিযোগ, রুটিন মেইনটেন্যান্স, স্লিপ ফান্ড, প্রাক-প্রাথমিক ও শিশু বরাদ্দ, জাতীয় দিবস উদযাপন ফান্ড, ইন্টারনেট চার্জ এবং জরুরি মেরামত খাতের অর্থের কোনো সঠিক ব্যবহার করা হয়নি।
প্রধান শিক্ষিকা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো বিদ্যালয় পরিচালনা করেন। তিনি ঠিকমতো জাতীয় পতাকা উত্তোলন বা সমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) পরিচালনা করেন না। এ কারণে বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন বা মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদ্যালয়টির দপ্তরী-কাম-নৈশপ্রহরী মিঠুন সরকারের কাছ থেকে চাবি কেড়ে নেন প্রধান শিক্ষিকা রায়হানা রাব্বি।
ভুক্তভোগী মিঠুন সরকার বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই প্রধান শিক্ষিকা আমার কাছ থেকে চাবি কেড়ে নেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেন।
অন্যদিকে, চারজন শিক্ষকবিশিষ্ট এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও ক্লাস্টার কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জছিজুল আলম মন্ডল বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে সহকারী শিক্ষিকা দীপালী রানী রায়কে প্রতিস্থাপন করেন পার্শ্ববর্তী একটি বিদ্যালয়ে। কিন্তু তার পরিবর্তে কোন শিক্ষক বা শিক্ষিকাই দেননি বিদ্যালয়টিতে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষিকার সাথে বনিবনা না হওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রতিস্থাপনের নামে বিদ্যালয় ছাড়েন সহকারী শিক্ষিকা দীপালী রাণী রায়। এ বিষয়ে জানতে দীপালী রানী রায়ের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিচয় জেনে কল কেটে ফোন বন্ধ করে দেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষিকা রায়হানা রাব্বীর মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও সংযোগটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাস বলেন, বিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো আমার জানা আছে। প্রধান শিক্ষিকার দৈনন্দিন হাজিরা ও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা অফিসারের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করেছি। যতটুকু জানি, পূর্বেও এসব অনিয়মের শাস্তিস্বরূপ বদলি (পানিশমেন্ট ট্রান্সফার) হয়ে তিনি এই বিদ্যালয়ে এসেছিলেন।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, এ সব অনিয়মের বিষয় আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারি।লিখিতভাবে এখনো আমার কাছে আসেনি। খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শালমারা গোড়ক পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই ভঙ্গুর অবস্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত তদন্তপূর্বক কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল। এর সাথে দপ্তরী কাম নৈসপ্রহরী
এর মিঠুন রায় কে চাকুরী তে পুনর বহাল এর দাবি করেন।
