বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ দৃষ্টিহীন ও অচল শরীর, তবু সংসারের হাল ইউনুসের হাতে

দৃষ্টিহীন ও অচল শরীর, তবু সংসারের হাল ইউনুসের হাতে

মোঃ রবিন খান, নাটোর প্রতিনিধি : নাটোরের মাছবাজারের গলির মুখে খাঁচাভর্তি কোয়েল পাখি নিয়ে বসেন ইউনুস আলী (২৮)। ক্রেতা পছন্দের পাখি দেখিয়ে দিলে খাঁচা থেকে সেটি বের করে জবাই করেন। এরপর পরিষ্কার করে তুলে দেন ক্রেতার হাতে। কাজগুলো করেন সাবলীলভাবে। তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই আট বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে তিনি দুই চোখের দৃষ্টি ও দুই পায়ের শক্তি হারিয়েছেন।

এই পাখি বিক্রেতার নাম ইউনুস আলী। তিনি নাটোর শহরের রথবাড়ি রাজাপুর মহল্লার আবুল কালামের ছেলে। প্রতি রবিবার শহরের তেবাড়িয়া হাটে ও বাকি দিনগুলো শহরের নিচাবাজারে কোয়েল পাখি বিক্রি করেন। পাখি বিক্রির এই আয় দিয়ে নিজের পাশাপাশি বৃদ্ধ মা ও বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া বোনের সংসারও চালান এই তরুণ। আস্তে আস্তে তিনি শারীরিক অক্ষমতাকে পেছনে ফেলে সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন।

শৈশবে ইউনুস ছিলেন আর আট দশজন শিশুর মতোই। স্কুলে যেতেন, খেলাধুলা করতেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। আট বছর বয়সে শহরের শের–ই–বাংলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় জ্বর ও পেটব্যথার সমস্যা দেখা দেয়। শহরের এক চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন। এরপরই বিপর্যয় শুরু হয়। চিকিৎসা চলাকালেই তাঁর দুই পা অচল হয়ে যায়, হারিয়ে ফেলেন দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি।

টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা হলো না। পড়ালেখা ও খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু জীবনটা রয়ে গেল। বাড়িতে শুয়েবসে কাটছিল জীবন। হঠাৎ তিন বোন, দুই ভাই ও মাকে রেখে বাবা সংসার বাঁধেন অন্যত্র। শুরু হয় জীবনসংগ্রাম।

বড় সন্তান হওয়ায় তরুণ বয়সেই একটা বড় সংসারের ভার এসে পড়ে ইউনুসের ওপর। প্রতিবন্ধী ভাতা হিসেবে প্রতি মাসে পেতেন ১ হাজার ৫০০ টাকা। এত অল্প টাকা দিয়ে সারা মাসের এক বেলা খাওয়ার খরচই হতো না। তাই ব্যবসা করার চিন্তা করলেন। কিন্তু এত অল্প টাকায় কী ব্যবসা করবেন। অবশেষে এক খামারির পরামর্শে তিনি কোয়েল পাখি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলেন। এক মাসের ভাতার টাকা দিয়ে ৮০টি কোয়েল পাখি কিনে বিক্রি শুরু করেন। তাঁর লেনদেনে খুশি হয়ে খামারি আগাম টাকা ছাড়ায় প্রথমে প্রতি সপ্তাহে ৫০০টি, পরে এক হাজার পাখি দেন। সপ্তাহান্তে দাম পরিশোধ করেও দুই হাজার টাকা লাভ হয়। এভাবেই ইউনুস হয়ে উঠলেন একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তিনি গড়ে তুললেন ইউনুস কোয়েল ফার্ম।

স্বল্প পুঁজির জন্য কোয়েল পাখি বিক্রির ব্যবসা বেছে নিলেও ইউনুসের জন্য এই ব্যবসা করা সহজ ছিল না। দৃষ্টিহীন অচল ইউনুসের পক্ষে খামারি ও ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও হিসাব–নিকাশ রাখাটা ছিল দুরূহ কাজ। এ ছাড়া বাড়ি থেকে হাটবাজারে যাতায়াত, দোকানের জন্য নির্ধারিত জায়গা না থাকা, পাখি জবাই করা, পরিষ্কার করা নিয়েও বিড়ম্বনার শেষ ছিল না। কিন্তু তিনি সব সময় মনে করেন, এটা তাঁর জন্য শুধু ব্যবসা নয়, এটা ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই, আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার লড়াই।

জীবিকার এই লড়াইয়ে সবাই যে ইউনুসের প্রতি সহানুভূতিশীল, তা নয়। দৃষ্টিহীনতার সুযোগ নিয়ে কেউ কম টাকা দিয়ে থাকেন। কেউ ছেঁড়া টাকা ও জাল টাকা ধরিয়ে দেন। কেউ কম টাকা দিয়ে বেশি টাকা দেওয়ার দাবি করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে কষ্ট দেয়। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েন না, ধৈর্য ধরেন।

ব্যবসা ভালোই চলছিল। গত শীতে হঠাৎ তাঁর সংগ্রহে রাখা সব পাখি (এক হাজার) মারা যায়। খামারির টাকা পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। ভেবেছিলেন, এখানেই সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ইউনুসের এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ান নাটোর পৌরসভার সাবেক মেয়র এমদাদুল হক আল মামুন। তিনি তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেন। সেই টাকা খামারিকে দিয়ে আবার ব্যবসা শুরু করেন তিনি।

ইউনুসের বোন রিনি খাতুন বলেন, স্বামী আমাকে তালাক দেওয়ার পর এই ভাই আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন। আমার যখন যা প্রয়োজন সর্বচ্চ দিচ্ছেন। আমি তাঁর কাছে ঋণী।

সংসারে মা–বোনকে বোঝা মনে করেন না ইউনুস, বরং তাঁদের তাঁর চোখের আলো মনে করেন। তাঁরাই তাঁর ব্যবসার বাধাগুলো সমাধান করেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সহযোগিতা করেন।

মা রাজিয়া বেগম বলেন, অনেকের সন্তান কর্মক্ষম হয়েও কর্ম করে না। অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অন্ধ ও অচল হয়েও তাঁর ছেলে সংসারের উন্নতির জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন।

শহরের নিচাবাজারের মাছপট্টির গলির অন্তত পাঁচ ক্রেতার বলেন, ইউনুস আলী একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী। তিনি খুব কম লাভে পাখি বিক্রি করেন। নিখুঁতভাবে পাখি জবাইয়ের পর পরিষ্কার করে দেন। এ জন্য তাঁরা তাঁর কাছ থেকেই নিয়মিত পাখি কেনেন। তাঁর পাশে থাকতে পছন্দ করেন।

ইউনুস আলী বলেন, অর্থ দিয়ে আমাকে সহযোগিতা না করলেও চলবে। আমার যাতায়াতের জন্য কেউ একটা যানবাহন দিলে ভালো হতো। ব্যবসার জন্য বাজারে একটা নির্ধারিত জায়গা দিলে উপকার হতো। কারণ, আমি যেখানে বসি, সেখানে সকাল ১০টা পর্যন্ত মাছ বিক্রি হয়। পরে আমাকে দোকান দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এতে বেচাকেনা কম হয়।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা