মোঃ মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি : কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে চার পরিবারের পাঁচ শিশু সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে এমন কর্মকাণ্ডে এলাকায় দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের নেশা অগণিত পরিবারের শতাধিক নারী-পুরুষ এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, নেশার টাকা জোগাড় করতে নিজেদের উরসজাত সন্তানদের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে অন্যের কাছে তুলে দেওয়ার পর সেই অর্থ মাদক কেনা ও সেবনে ব্যয় করছে।
উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামের চার পরিবারের পাঁচটি শিশু সন্তানকে পৃথক সময়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুলাল মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী ফারজানার নবজাতক ছেলে সন্তান ২ সেপ্টেম্বর ৬০ হাজার টাকা, জজ মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন তা দুই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেয়া দুটি শিশু সন্তান ১ লাখ ৫০ হাজার ও ২০ হাজার টাকা, আসাদ মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন ৭৭ হাজার টাকা এবং মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে আসাদ মিয়ার সন্তান ২ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সন্তানদের প্রথমে যাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ কেউ আবার অন্য জায়গায় আরো বেশি টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে এসব শিশুর বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চরপুক্ষিয়া গ্রামের জয়নাল মিয়া, বকুল মিয়া, বাবুল মিয়া, জামাল মিয়া, কালা চান, সখিনা, কালুমিয়া, নুরুন্নাহার ও গ্রাম পুলিশ দুলাল মিয়াসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, গ্রামে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে না পেরে মাদকাসক্ত বাবা-মা সন্তানদের টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দিচ্ছেন। সেই টাকা দিয়ে মাদক কেনা ও সেবন করছে তারা।
তারা আরো বলেন, আমাদের মহল্লার ছেলে মেয়েদের ভালো কোথাও বিয়ে দিতে বা করাতে পারিনা। অনেকেই প্রকাশ্যে বলে ফেলে এই গ্রামের সব বয়সের নারী পুরুষ মাদকাসক্ত। আমরা নিজেরাও অসহায়, প্রতিবাদ করার সাহস পাই না। আমাদেরও ছোট ছোট সন্তান আছে। প্রতিবাদ করলে আমাদের সন্তানদেরও নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়ার ভয় রয়েছে।
তাদের আরও অভিযোগ, শিশুদেরও মাদকের সংস্পর্শে আনা হচ্ছে। এমনকি প্রায় পাঁচ বছর বয়সী শিশুকে মাদক সেবন করানোর অভিযোগ করেছেন তারা। অনেক বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী ছেলে মেয়ে একসঙ্গে মাদক সেবন করেন বলেও দাবি তাদের।
মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কথা বললে হামলা, হয়রানি কিংবা নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে অনেকেই সবকিছু দেখেও নীরব থাকছেন। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই, কিন্তু নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েই আমরা আতঙ্কে থাকি।
কটিয়াদী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এক ছাত্র কষ্ট ও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে জানায়, আমি আমরা গ্রামের পরিচয় দিতে পারিনা । উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে আমাদের বাড়ি শুনলেই লোকজন টিটকারী করে বলে তোরা মাদকাসক্ত। তোদের গ্রামের লোকজন মাদকের টাকা জোগাড় করতে নিজেদের ছেলে মেয়ে বিক্রি করে দেয়। এসব কথা বলে আমাদের সাথে অনেকেই মিশতে চাইনা । আমরা ভালভাবে সুন্দর পরিবেশে বাঁচাতে চাই ।
কটিয়াদী মডেল থানা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। অথচ মাদকের বিস্তার ঠেকাতে দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রামের লোকজন।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় যদি মাদকের এমন বিস্তার ঘটে, তাহলে প্রত্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
তারা মাদকের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান, মাদকসেবী ও কারবারিদের শনাক্তকরণ এবং সন্তান বিক্রির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সন্তান বিক্রির অভিযোগ ওঠা পরিবারগুলোর সদস্যরা সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানান, উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে মাদকের ছোবল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাদক সেবনের টাকার জন্য বিভিন্ন সময়ে পাঁচটি শিশু সন্তান বিক্রি করে দেয়ার কথা শুনেছি। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য সামাজিক ও প্রশাসনের সহায়তায় কাজ করব।
কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে দারিদ্র্যতা ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে তাদের উরসজাত সন্তানদের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ পেয়েছি। মাদক নির্মূলে আইনগত ব্যবস্থা ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
