জনতা ডেস্ক : সউদী আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের এক প্রাণঘাতী হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় চলছে। বেশিরভাগ আরব দেশ এ হামলার জন্য হুথিদের তীব্র নিন্দা করেছে। শনিবার পরিচালিত এই হামলাকে সউদী কর্তৃপক্ষ রাজতন্ত্র ও হুথিদের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের এক নাটকীয় তীব্রতা বৃদ্ধি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে যে বিষয়ে আরবনেতারাসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ নীরব তা হচ্ছে ২০১৫ সালে, হুথি মিলিশিয়া ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে দেশটির সরকারকে উৎখাত করার পর তাদের বিরুদ্ধে একটি ব্যর্থ ও মারাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল সউদী আরব। পরবর্তীতে সংঘটিত এই নির্মম যুদ্ধে সহিংসতা, ক্ষুধা ও রোগে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। তবে এতকিছুর পরও হুথিরা টিকে থাকে এবং উত্তর ইয়েমেনের ওপর তাদের কর্তৃত্ব সুসংহত করে। শুধ গত একমাসেই সউদী জোটের বিমান হামলায় ইয়েমেনে ৯১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রিয়াদের বিমানবন্দরের এ ঘটনাই কোনো উপসাগরীয় আরব দেশে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ এবং প্রাণঘাতী হামলা। শীর্ষস্থানীয় এক হুথি কর্মকর্তা এ হামলার দায় স্বীকার করেছেন। রোববার ভোরে সউদী বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নতুন হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করে। এতে জানানো হয়, নিহত ১২ জনের মধ্যে চারজন সউদী নাগরিক এবং একজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। সংস্থাটি আরও জানায়, আহত ৩০৯ জনের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।
পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় হামলায় এক মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর আগে, রাজতন্ত্রের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেয় সউদী বিমান চলাচল সংস্থা। চলতি সপ্তাহে এই বিমানবন্দরে হুথিদের উপর্যুপরি ও মারাত্মক হামলা, রিয়াদকে একটি বিশ্বমানের ভ্রমণ ও বাণিজ্য কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের যে লক্ষ্য ছিল, তার মূল ভিত্তিমঞ্চেই আঘাত হেনেছে। এর ফলে আসন্ন সপ্তাহগুলোতে পরিকল্পিত বড় বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানগুলো ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সউদী নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট রবিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হুথিদের এই হামলা সরাসরি বিমানবন্দরের একটি প্যাসেঞ্জার টার্মিনালকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। জোটটি এর এক কঠোর ও নির্ণায়ক জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
সীমান্তের ওপারে ইয়েমেনে সউদী যুদ্ধবিমানগুলো হুথিদের বিরুদ্ধে তীব্র বোম্বিং অভিযান চালিয়ে আসছে। হুথিদের দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাদের অঞ্চলজুড়ে শত শত বিমান হামলা চালানো হয়েছে। হুথি সরকার-সংযুক্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আনিস আল-আসবাহির মতে, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিমান হামলায় ইয়েমেনে ৯১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
হুথিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি জানান, শনিবার রিয়াদে পরিচালিত এই হামলার দায় তাদের মিলিশিয়া বাহিনীর। ইয়েমেনের বেসামরিক অবকাঠামোসহ অন্যান্য স্থানে সউদী বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
আল-বুখাইতি বলেন, হুথিরা এই হামলা এই কারণেই চালিয়েছে “যাতে বিশ্ব অনুধাবন করতে পারে যে ইয়েমেনের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, বিবাহ ও শোক অনুষ্ঠানস্থল, হাসপাতাল এবং বাজারগুলো বেসামরিক প্রতিষ্ঠান এবং এগুলোতে আক্রমণ বা ক্ষতি করা যাবে না। ঠিক একইভাবে, ইয়েমেনের ক্ষেত্রে যে নিয়ম খাটে, পৃথিবীর অন্য যেকোনো স্থানের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হতে হবে।”
সউদী কর্মকর্তারা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কিত প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর দেননি। তবে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিনিধি বিমানবন্দরে অন্তত ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ছুটে যেতে দেখেছেন, যেখানে পুলিশ প্রবেশপথ আটকে রেখেছিল।
রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাস তাদের নাগরিকদের উক্ত এলাকাটি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে এবং যাতায়াতে সম্ভাব্য বিঘ্নের বিষয়ে সতর্ক করেছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমরা এইমাত্র সাম্প্রতিক আক্রমণের বিষয়ে জানলাম।” সংঘাতটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ বা অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি “সিদ্ধান্ত নেবে।” উল্লেখ্য, গত বছর হুথিদের বিরুদ্ধে এক বিমান হামলা অভিযান চালিয়েছিলেন ট্রাম্প, যেখানে প্রথম মাসেই প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারের পর দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
সউদী কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চলতি সপ্তাহের শুরুতেও রিয়াদ এবং রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলের আবহা বিমানবন্দরে হামলা চালায় হুথিরা, যাতে বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হন।
ইয়েমেনে অবস্থানরত সউদী নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি রবিবার ভোরের দিকে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ না করে জানান, পূর্ব সউদী আরবের বাদশা ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় “একটি প্রোজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র/গোলা)” এসে পড়েছে।
এর আগে ২০১৫ সালে, হুথি মিলিশিয়া ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে দেশটির সরকারকে উৎখাত করার পর তাদের বিরুদ্ধে একটি ব্যর্থ ও মারাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল সউদী আরব। পরবর্তীতে সংঘটিত এই নির্মম যুদ্ধে সহিংসতা, ক্ষুধা ও রোগে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। তবে এতকিছুর পরও হুথিরা টিকে থাকে এবং উত্তর ইয়েমেনের ওপর তাদের কর্তৃত্ব সুসংহত করে।
২০২২ সালের একটি যুদ্ধবিরতি দেশটিতে একটি ভঙ্গুর শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল, যা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপরেই পুরো অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
জুলাই মাসে সানা বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণের জন্য হুথিরা রাজতন্ত্রকে অভিযুক্ত করলে সউদী আরব ও তাদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। সউদী-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার পরবর্তীতে সেই বোমাবর্ষণের দায় স্বীকার করে এবং জানায়, একটি অননুমোদিত ইরানি বিমান অবতরণ ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
সউদী আরব কর্তৃক তাদের আকাশসীমার ওপর দীর্ঘদিনের অবরোধ ও বাধানিষেধ নিয়ে হুথিরা ক্ষুব্ধ ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা দ্রুতই “অবরোধের বদলে অবরোধ” নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয় এবং লোহিত সাগরে সউদী জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর, লোহিত সাগরই ছিল সউদীর তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথ।
এর পরপরই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ আবারও উসকে ওঠে এবং হুথিদের সাথে সউদী-সমর্থিত ও সরকারি অনুগত বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ শুরু হয়।
গত মাসে একটি আকস্মিক অভিযানের মাধ্যমে হুথিরা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিজেদের দখলে নেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত হয়।
অবশেষে গত সপ্তাহান্তে তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। সউদী-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়ে বিগত ১২ বছরে তাদের দখল করা সমস্ত ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করে। একই সাথে সউদী আরবও হুথিদের ওপর নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করে।
এই সিদ্ধান্ত রাজতন্ত্রকে হুথিদের প্রধান সমর্থক ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রতিফলনের আরও গভীরে ঠেলে দিয়েছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন—একদিকে হুথি হামলা বন্ধ করা এবং অন্যদিকে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এড়ানো, যা তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের দাবি দিন দিন বাড়তে থাকায় এই সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে অভিজ্ঞ এবং ইতোমধ্যে ধ্বংসস্তূপ অবকাঠামোবিশিষ্ট একটি অঞ্চল শাসন করা হুথি নেতারা মনে করছেন, সউদী আরব তাদের যতটা ক্ষতি করতে পারবে, তারা সউদী আরবের তার চেয়েও বড় ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম।
আগামী সপ্তাহগুলোতে রিয়াদে কয়েকটি বড় বিশ্বমানের অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে অতিথিদের উপস্থিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রবিবারে ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেসের মাধ্যমে এর সূচনা ঘটার কথা, যা জ্বালানি খাতের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নির্বাহীদের একটি আন্তর্জাতিক মিলনমেলা।
শুক্রবার শেষ রাতে অংশগ্রহণকারীদের পাঠানো এক ইমেইলে আয়োজকরা জানান, সম্মেলনটি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে এবং সউদী আরবের জাতীয় বিমান সংস্থা ‘সউদীয়া’র মাধ্যমে বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, শনিবার পথ ঘুরিয়ে দেওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে সউদীয়ার বিমানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এছাড়া এই মাসের শেষভাগে রিয়াদে ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ আয়োজনের কথা রয়েছে, যা ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদের বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলন নামে পরিচিত। এতে সাধারণত বিশ্বনেতা, কোটিপতি ও বিশ্বের শীর্ষ নির্বাহীরা যোগ দিয়ে থাকেন। আয়োজকরা এখন পর্যন্ত এই অনুষ্ঠানের সূচিতে কোনো পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেননি।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস।
