বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: সব সরকারের আমলেই প্রতিশ্রুতির দোলাচলে দুলে আসছে খুলনার শিল্প সেক্টর। কিন্তু আলোর মুখ দেখছে না কোনভাবেই। এ যেন ভাঙ্গা গড়ার এক করুণ উপাখ্যান। দেশ স্বাধীনের আগে থেকে খুলনায় একের পর এক গড়ে ওঠে শিল্পকারখানা। আশির দশকেও এসব কারখানা ঘিরে ছিল হাজারো মানুষের কর্ম ব্যস্ততা। কিন্তু এখন সবই অতীত। একদিকে নতুন কারখানা গড়ে ওঠেনি, অন্যদিকে একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে বড় বড় পাটকল। দীর্ঘদিন লোকসানের পর এসব কারখানা বন্ধ হয়েছে। বেকার হয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক।
ছাত্র জনতার গনঅভ্যুত্থানের পর আশায় বুক বেধেছিল চাকুরিচ্যুত শ্রমিক ও তাদের পরিবার পরিজন। শিল্প কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর কথা দিয়েছিলো শিল্প উপদেষ্টা। কথা রাখেনি অন্তবর্তীকালীন সরকার। খুলনাঞ্চলের শিল্প কলকারখানাগুলো বন্ধের অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বেচ্ছাচারিতা এবং কারখানার ব্যবস্থাপক ও অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলেমিশে শ্রমিকনেতাদের দুর্নীতি। ফলে একে একে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান হারিয়েছেন মানুষ। ভাটা পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। তবে আশার আলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী ওয়াদা। তিনি খুলনার জনসভায় এ অঞ্চলের মানুষকে বন্ধ শিল্প কলকারখানা চালুর পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্প স্থাপনা নির্মানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে খুলনাবাসীকে বাঁচার নতুন স্বপ্ন দেখান। আর সম্প্রতি বানিজ্য মন্ত্রীর আশ^াসে ফের আশার আলো দেখছে অন্ধকারে নিমজ্জিত শ্রমিক সেক্টর।
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, রুগ্ন ও বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি আরো বলেন, দেশের শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত করা, বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং জরুরি পণ্যের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার একটি সমন্বিত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। বস্ত্র ও পাট খাতের প্রায় ৫০টি বন্ধ ও রুগ্ন মিলকে পর্যায়ক্রমে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, উৎপাদন বাড়বে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
এদিকে থমকে আছে খুলনার ১০টি মেগা উন্নয়ন প্রকল্প। কৃষিভিত্তিক ও নদীকেন্দ্রিক শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকা স্বত্ত্বেও অর্থনৈতিক এই জোনে শিল্প বিপ্লবের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকে সচল করতে গত এক যুগে একের পর এক অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা নেয়া হলেও খুলনাঞ্চলে কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি। জমি অধিগ্রহণ, প্রস্তাব পাঠানো এবং প্রকল্প অনুমোদনের পরও বাস্তবায়ন হয়নি একটিও। কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ এই উদ্যোগগুলো স্থবির করে রেখেছে এ অঞ্চলের শিল্পায়ন সম্ভাবনা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্যাস সংযোগ না হওয়ায়। এতে যেমন বাড়েনি বিনিয়োগ, তেমনি সৃষ্টি হয়নি কাঙ্খিত কর্মসংস্থানও। বরং রাজনৈতিক দূরদর্শীতার অভাবে খুলনাঞ্চলের পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে শিল্পনগরী খুলনা শিল্পের ঐতিহ্য হারিয়েছে।
সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ আহবায়ক কুদরত-ই-খুদা বলেন, পাটকলে লোকসানের বড় কারণ কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট। পাটকলগুলো দেরিতে বেশি দামে পাট কিনত। সরকারি পাটকলে কম উৎপাদনশীলতা, উৎপাদন খরচ বেশি, পুরোনো যন্ত্রপাতি ও বেসরকারি খাতের তুলনায় শ্রমিকের মজুরি ছিল বেশি। অবিক্রীত পণ্য গুদামে পড়ে থাকত। প্রতিবছর পাটের মৌসুমে কাঁচা পাট কিনতে সরকারের কাছে হাত পাততে হতো। এ ছাড়া বাজারজাতকরণে উদ্যোগ, সমন্বয়হীনতা, কাঁচামালের সংকট, বেশি জনবল, সিবিএর দৌরাত্ম্য পাটকলগুলোর লোকসানের অন্যতম কারণ।
বিজেএমসির সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, অর্থের অভাবে সময়মতো পাট কেনা যেত না। জুলাই মাস পাট কেনার ভরা মৌসুম হলেও সময়মতো অর্থ না পাওয়ায় কেনা হতো অক্টোবর-নভেম্বরে। এ ছাড়া লোকসানের আরেকটি কারণ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগের সময় হাজার হাজার শ্রমিককে স্থায়ী করা হয়েছে। লোকসানে জর্জরিত সরকারি পাটকলে প্রায় তিন গুণ মজুরি বাড়ানো হয়েছে। এতে খরচও অনেক বেড়ে যায়।
এদিকে, খুলনায় প্রায় দুই দশক ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে খুলনা নিউজপ্রিন্টসহ বন্ধ তিন কারখানার জমি। এসব জমিতে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি কয়েক বছরেও। ফলে এসব কারখানার চাকরি হারানো শ্রমিকরা অনিশ্চয়তা ও হতাশায় দিন পার করছেন। বন্ধ এ তিন কারখানার জমিতে বিভিন্ন সময় নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। কাগজকল, সার কারখানা ও এসিড কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। সবই যেন শুভংকরের ফাঁকি। কর্তা ব্যক্তিরা এসব প্রকল্পে পরিদর্শনে আসেন, দেখেন এবং একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যান। কিন্তু বছরের পর বছর প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখছে না।