শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ হোটেল-মোটেলের বর্জ্য যাচ্ছে সাগরে পর্যটকের অস্বস্তি, হুমকিতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য

হোটেল-মোটেলের বর্জ্য যাচ্ছে সাগরে পর্যটকের অস্বস্তি, হুমকিতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য

এইচ এন আলম, ঈদগাঁও, কক্সবাজার প্রতিনিধি : পর্যটন নগরী কক্সবাজারে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটকের আগমনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও কটেজ। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেই নেই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি)। ফলে হোটেল-মোটেল ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য ও মানববর্জ্য নালা-নর্দমা হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এতে একদিকে সমুদ্রসৈকতের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে অস্বস্তিতে পড়ছেন পর্যটকরা। পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে সামুদ্রিক মাছ, প্রবালসহ নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র্য।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের তথ্যমতে, সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি কলাতলী ও হোটেল-মোটেল জোন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ শতাধিক আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও কটেজ রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে পাঁচ শতাধিক রেস্তোরাঁ।

নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদিত বর্জ্য পরিশোধনের জন্য নিজস্ব স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) অথবা কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, হাতেগোনা কয়েকটি তারকা মানের হোটেল ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য শোধনের আধুনিক কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান এসটিপির পরিবর্তে সাধারণ সেপটিক ট্যাংক ব্যবহার করছে।

কক্সবাজার সিটি কলেজের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মইনুল হাসান পলাশ বলেন, অপরিকল্পিত সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য ও হোটেলগুলোর তরল বর্জ্য বিভিন্ন নালা-নর্দমা হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুম ও বর্ষাকালে এ দূষণের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, এর ফলে সাগরের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। দূষিত পানিতে গোসল করতে নেমে পর্যটকদের কেউ কেউ চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হোটেল-মোটেল জোনের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে শুধু সমুদ্র নয়, আশপাশের পরিবেশ ও পানির উৎসও দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলতে থাকলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অতীতে ভবন নির্মাণের সময় এসটিপি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় অনেক বহুতল হোটেল ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের উদাসীনতার কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

পরিবেশ সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতি ও সাংবাদিক ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, এভাবে চলতে থাকলে দেশের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র কক্সবাজার একসময় তার আকর্ষণ হারাবে। পরিবেশ দূষণ অব্যাহত থাকলে পর্যটকরাও ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।

তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় প্রতিটি হোটেল-মোটেলে পৃথক এসটিপি স্থাপন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা ‘সেন্ট্রাল এসটিপি’ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের মতে, শুধু পর্যটক বাড়ানোর পরিকল্পনা নয়, কক্সবাজারের পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। পর্যটন নগরীকে টেকসই রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর পরিবেশগত ক্ষতির দায় বহন করতে হবে পুরো কক্সবাজারবাসীকেই।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা