সফিকুল ইসলাম: কর্মজীবনের সকল ব্যস্ততা শেষে প্রতিবছর প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি-খোশগল্প আর ছোট্টবেলার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের মতো বিরল আশা নিয়ে নগরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছে লাখো মানুষ। কিন্তু সেই প্রত্যাশা বেশিরভাগ মানুষের পূরণ হলেও অনেকের আনন্দের ঈদযাত্রায় বিশাদে পরিনত হচ্ছে ‘মৃত্যুর মিছিলে’। প্রতি বছরের মতো এবারও সড়কে ঝরছে অসংখ্য তাজা প্রাণ, যার ফলে ঈদযাত্রা পরিণত হচ্ছে মৃত্যুযাত্রায়। বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ বা ক্লান্ত চালক এবং ট্রাফিক আইন না মানার কারণে প্রতি বছর ঈদে শত শত মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে, যা স্বজনদের জন্য এক গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল আজহার দুইদিন আগে ঢাকা-টাঙ্গাইল যমুনা সেতু মহাসড়কের সরাতৈল এলাকায় রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ঝড়ে গেলে ১৫ প্রাণ। নিমেষেই শেষ হয়ে গেলে তাদের পরিবারের সঙ্গে ঈদ ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। সোমবার ভোর ৪টার দিকে মহাসড়কের সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের ১৫ জনের মধ্যে ৬ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- নওগা জেলার মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্র বাড়ি এলাকার সাকিম মিয়ার ছেলে সাগর মিয়া, একই এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম, রাজশাহীর তানুর উপজেলার বাতানপুর এলাকার আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন, চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের নজরুল, মামুন, নওগাঁর নেয়ামতপুর মালঞ্চী এলাকার সাইদুলের ছেলে সারিকুল। ট্রাক থেকে বেঁচে ফেরা নওগা জেলার মান্দা উপজেলার রাব্বানি বলেন, চট্টগ্রামের অলংকার থেকে সন্ধ্যার দিকে রওনা হই। ট্রাকের মধ্যে কেউ জেগে ছিল, কেউ ঘুমিয়ে ছিল। আমি নিজেও ঘুমিয়ে ছিলাম। ভোরে যখন দুর্ঘটনা হয়, আমি ছিটকে পড়ে যাই। আমার চাচা, চাচাতো ভাই ও বন্ধুরা সবাই মারা গেছে। আমি হকারের কাজ করে বাড়ি ফিরছিলাম। তবে স্থানীয় বুলবুল সরকার বলেন, ভোরে এই দুর্ঘটনা ঘটে। শব্দ শোনার পর সবাই ঘটনাস্থলে আসি। এমন দুর্ঘটনা কখনো দেখিনি। এক সঙ্গে ১৫ জন নিহত হয়েছে।
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোপালপুর সার্কেল) ফৌজিয়া হাবিব খান বলেন, সোমবার ভোরে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন।তারা সবাই উত্তরবঙ্গগামী যাত্রী ছিলেন। আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি যে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটি পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ১৫ জনের মৃত্যু হয়। মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
রংপুর থেকে বাড়ি ফেরা হলো বাবা-মেয়ের: বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে অজ্ঞাত একটি যানবাহনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল চালক বাবা ও মেয়ে নিহত হয়েছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার বনানী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন নিহতের স্ত্রী। তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতরা হলেন- আনিছুর রহমান ও তার চার বছর বয়সী মেয়ে পুষ্প। আহত আয়েশা বেগম নিহত আনিছুর রহমানের স্ত্রী। আনিছুর রহমান রংপুরে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকে কর্মরত ছিলেন। তবে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদের ছুটিতে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে রংপুর থেকে গ্রামের বাড়ি পাবনায় যাচ্ছিলেন আনিছুর রহমান। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তাদের মোটরসাইকেলটি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বনানী এলাকায় পৌঁছালে অজ্ঞাত একটি যানবাহন সেটিকে ধাক্কা দেয়। এতে তারা মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে মহাসড়কের ওপর পড়ে যান। ঘটনাস্থলেই আনিছুর রহমান ও শিশু পুষ্পর নিহত হয়। গুরুতর আহত হন আয়েশা বেগম। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সকাল ৭টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করেন। বগুড়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত নারীকে উদ্ধার করে শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নওগাঁয় ডাম্প ট্রাকের চাপায় নিহত ২: নওগাঁর পত্নীতলায় ডাম্প ট্রাকের চাপায় অটোরিকশা চালকসহ দুইজন নিহত হয়েছেন। রোববার দিবাগত রাত ২টার দিকে উপজেলার নজিপুর-ধামইরহাট আঞ্চলিক সড়কের গাহন মোড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন-জেলার মহাদেবপুর উপজেলার সুজাইল এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে আবু হাসান (৪৬) ও ধামইরহাট উপজেলার দুর্গাপুর এলাকার অছি উদ্দিনের ছেলে তরিকুল ইসলাম (৪৫)।
থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আটোরিকশাটি নজিপুর থেকে ধামইরহাট উপজেলার ফতেপুর বাজারের দিকে যাচ্ছিলো। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ডাম্প ট্রাক অটোরিকশাটি চাপে দিলে ঘটনাস্থলেই অটোরিকশা চালক আবু হাসান ও যাত্রী তরিকুল ইসলাম মারা যান। পরে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।
পত্নীতলা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিয়ামুল হক বলেন, রাত ২টার দিকে খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। ঘটনার পর ডাম্প ট্রাকটি পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
মুন্সীগঞ্জে পৃথক ২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২ : মুন্সীগঞ্জে ঢাকা-মাওয়া এবং ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে পৃথক দু’টি সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাক চালক মো. হোসেন (৩৫) এবং লরির হেলপার অন্তর দাস (১৮) নিহত হয়েছে।
নিহতরা হলো-চুয়াডাঙ্গা জেলার বেলগাজি উপজেলার মুসলিম পাড়ার মো. টাবুর পুত্র ট্রাক চালক মো. হোসেন এবং সেনবাগ উপজেলার চাদঁপুর গ্রামের মানিক দাসের পুত্র হেলপার অন্তর দাস।
পুলিশ জানায়, সোমবার রাত ২টায় ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দোগাছি সেনা ক্যাম্পের সামনে মাওয়ামুখী লেনে একটি মালবাহী ট্রাক সামনের মালবাহী ট্রাককে ধাক্কা দেয়। এতে পিছনের ট্রাকের ভিতর আটকা পড়ে ট্রাকচালক মো. হোসেন। তাকে মারাত্নক আহত অবস্থায় শ্রীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। হাসাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মামুন আল রশিদ বাসস’কে জানান মো. হোসেনের মরদেহ হাসাড়া থানায় রয়েছে।
অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে সড়কে ‘মৃত্যুর মিছিল’ : পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে সড়কে ‘মৃত্যুর মিছিল’ শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করেনি বাস মালিক সমিতি। গতকাল সোমবার সংবাদ মাধ্যমে সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর পাঠানো বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ঈদযাত্রায় বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এতে দরিদ্র, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ কম খরচে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় অনেকেই খোলা ট্রাক, পণ্যবাহী যান বা ট্রেনের ছাদে যাতায়াত করছেন। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে নওগাঁগামী রডবোঝাই ট্রাক উল্টে টাঙ্গাইলে ১৭ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া নরসিংদীর ঘোড়াশালে ট্রেনের ছাদে বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রতি বছর ঈদে লাখো শ্রমজীবী মানুষ অতিরিক্ত ভাড়ার চাপে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাতায়াতে বাধ্য হন। অথচ তাদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। অনতিবিলম্বে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ, বাস মালিকদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সরকারের নির্দেশনা কঠোরভাবে কার্যকরের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একই সঙ্গে যাত্রীদের বাস বা ট্রেনের ছাদে, খোলা ট্রাকে কিংবা ফিটনেসবিহীন যানবাহনে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচাক সাইদুর রহমান বলেন, দেশের ঈদযাত্রাসহ সব দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পুরো সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশের সঠিক পরিবহন ব্যবস্থা নেই; তাই এ সব দুর্ঘটনা কখনই প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সেজন্য দেশের পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সকল প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে নতুন করে সাজাতে হবে।
কথা হয় নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) মহাসচিব লিটন এরশাদ এর সঙ্গে। তিনি বলেন, মহাসড়কে দুঘটনা কমাতে প্রয়োজন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা। একইসঙ্গে সড়কে আইন প্রয়োগে শিথিলতার পরিবর্তনে আর কঠোর করতে হবে। একপ্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,সড়ক দুর্ঘটনা কখনোই শুধুমাত্র একটি ‘দুর্ঘটনা’ নয়। এর পেছনে থাকে অব্যবস্থা, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাব। সর্বশেষ সোমবার সড়কে ১৫টি প্রাণহানির দায় শুধু একজন চালকের নয়, শুধু একজন মালিকের নয়, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানেরও নয়। এই দায়ভার আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার উপরই বর্তায়। মানুষ চায় নিরাপদে বাড়ি ফিরতে। ঈদের আনন্দ যেন আর কোনো মায়ের চোখের জল না হয়, কোনো শিশুর এতিম হওয়ার কারণ না হয়। এখনই সময় সড়কে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং মানবিক দায়বদ্ধতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার। নইলে প্রতি ঈদেই নতুন নতুন লাশের মিছিল আমাদের ব্যর্থতার সাক্ষী হয়ে থাকবে।
বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, সারা বছর যে সড়কে যেসব অব্যবস্থাপনা থাকে ঈদের আগে চেষ্টা করা হয় যাতে সেসব ঠিক করা যায়। কারণ মনে করা হয় ঈদের আগে মুভমেন্ট বেশি হবে। ছুটি বাড়িয়ে দিলেও আমরা ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে পারিনি। ভাবা হয়, ছুটি বাড়িয়ে দেয়া হয়তো সমাধান; আসলে ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও দেখতে হবে। এবার যানজট যেমন বেশি, দুর্ঘটনাও বেশি। যে যেভাবে পারছে গাড়ি নামিয়েছে সড়কে। কেউ ব্রেক-ফেইল করছে, কেউ ক্লান্ত হয়ে গেলেও টানা গাড়ি চালাচ্ছে।
ঈদযাত্রায় থামছে না ‘মৃত্যুর মিছিল’
প্রকাশিতঃ মে ২৫, ২০২৬, ১২:০২