শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ সাভার-আশুলিয়ায় আশ্রয়ণের ঘর ‘বেচাকেনা’, এখন মাদকের আস্তানা

২৭টি ঘর হাতবদলের অভিযোগ,  প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত, দালালচক্রের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন

সাভার-আশুলিয়ায় আশ্রয়ণের ঘর ‘বেচাকেনা’, এখন মাদকের আস্তানা

ফাহাদ-ই-আজম, সাভার : ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প। সরকারি অর্থে নির্মিত এসব ঘর বরাদ্দ পাওয়ার কথা প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের। কিন্তু সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে বরাদ্দ পাওয়া ঘর টাকার বিনিময়ে হাতবদল হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও এক লাখ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা, আবার কোথাও দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঘর বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি প্রকল্পে মাদক কারবার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অনুসন্ধানে এমন কয়েকটি ঘরের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর সরকারি নথিতে এক ব্যক্তির নাম থাকলেও বাস্তবে বসবাস করছেন অন্য কেউ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দালালদের একটি চক্র সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এসব ঘর হাতবদলে সহযোগিতা করছে। এমনকি কিছু কথিত সাংবাদিকের নামও দালালি করে টাকা নেওয়ার অভিযোগে উঠে এসেছে।

সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে কয়েক ধাপে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩০৮টির বেশি ঘর নির্মাণ ও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

নথিতে এক নাম, বসবাস অন্যের

আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের হাজরতনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ঘর হাতবদলের একাধিক অভিযোগ।

প্রকল্পের বি-৩৪ নম্বর ঘরের সরকারি নথিতে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে ‘সাধন’-এর নাম রয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু বর্তমানে সেখানে অন্য ব্যক্তির বসবাসের অভিযোগ রয়েছে। ঘরের ভেতরে রয়েছে ৩২ ইঞ্চি স্মার্ট টেলিভিশন, ফ্রিজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র। স্থানীয়দের দাবি, ঘরটি দালালের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ টাকায় হাতবদল হয়েছে।

অনুসন্ধানের সময় ঘরটির বর্তমান দখলদারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে ক্যামেরার উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁর বক্তব্য পরিবর্তন হয় বলে প্রতিবেদকের দাবি।

একই প্রকল্পের ডি-৯ নম্বর ঘরের সরকারি বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি মোসা. আয়শা। তবে বর্তমানে সেখানে নুরজাহান বসবাস করছেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘরটি হাতবদল হয়েছে।

ডি-৫ নম্বর ঘরটির সরকারি নথিতে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি রোমানা বেগম। অভিযোগ রয়েছে, দালালদের সহযোগিতায় তিনি প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকায় ঘরটি রুবিনা বেগমের কাছে বিক্রি করেছেন।

শুধু এই তিনটি নয়—স্থানীয়দের অভিযোগ, একই প্রকল্পের ডি-১০, ডি-১১, ডি-১৭, ডি-১৯, বি-৮, বি-১২, বি-১৭ ও বি-১৯ নম্বর ঘরও টাকার বিনিময়ে হাতবদল হয়েছে। এসব ঘরের কয়েকটির মূল বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বর্তমানে সেখানে নেই বলে দাবি স্থানীয়দের।

অভিযোগের কেন্দ্রে দালালচক্র

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কেনাবেচায় কুলু মুদ্দিন, মুসা, শাহাদাত ও আব্বাস নামে কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমে ঘর হাতবদল হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্পের কয়েকজন বাসিন্দা।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এসব ব্যক্তির কেউ কেউ সুবিধাভোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন।

এ ছাড়া ঘর বরাদ্দ বা হাতবদলের ক্ষেত্রে কয়েকজন কথিত সাংবাদিকের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দালালি নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত নথি বা অর্থ লেনদেনের প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

হলমার্ক আশ্রয়ণ প্রকল্পেও হাতবদলের অভিযোগ

সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের কাঞ্চনকাঠি গ্রামের হলমার্ক আশ্রয়ণ প্রকল্পেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে মোট ৩৩টি ঘর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের কয়েকটি ঘর দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দামে হাতবদল হয়েছে। বর্তমানে সেখানে বসবাসকারীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

তাদের ভাষ্য, গৃহহীনদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে তৈরি প্রকল্পটি এখন কোথাও কোথাও মাদক কারবারের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

৩০৮টির বেশি ঘরের প্রকল্প

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সাভার-আশুলিয়া এলাকায় বিভিন্ন পর্যায়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর সংখ্যা—

– প্রথম পর্যায় — ৪১টি
– দ্বিতীয় পর্যায় — ৫১টি
– তৃতীয় পর্যায় (প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ) — ১৪৫টি
– চতুর্থ পর্যায় — ৭১টি

এলাকাভিত্তিক তথ্যের মধ্যে আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নে ৪০টি, সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাদুল্লাপুরে ৩২টি, বনগাঁও ইউনিয়নের কান্দিবলিয়ারপুরে ৪৪টি, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের কাঞ্চনকাঠিতে ৩৩টি এবং ভাকুর্তা ইউনিয়নে ৩৭টি ঘরের তথ্য পাওয়া গেছে।

৭২টির মধ্যে ২৭ ঘর হাতবদলের অভিযোগ

আশুলিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৭২টি ঘরের মধ্যে ২৭টি ঘর টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে হাতবদল বা বিক্রি হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগটি সত্য হলে তা আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কারণ প্রকৃত ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের জন্য দেওয়া সরকারি ঘর যদি অর্থের বিনিময়ে অন্যের দখলে চলে যায়, তাহলে প্রকল্পের সুবিধা থেকে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হন।

প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো কীভাবে হাতবদল হচ্ছে, কারা মধ্যস্থতা করছে, অর্থের লেনদেন কীভাবে হচ্ছে এবং বরাদ্দের পর সুবিধাভোগীদের বিষয়ে প্রশাসনিক নজরদারি কতটা হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা জরুরি।

প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বরাদ্দ তালিকা, সুবিধাভোগীদের পরিচয়, বর্তমান দখল পরিস্থিতি, জমির রেকর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের পরিদর্শন প্রতিবেদন যাচাই করা যেতে পারে। এতে প্রকৃত সুবিধাভোগী ও বর্তমান দখলদারের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে।

ইউএনওকে ফোনে পাওয়া যায়নি

এসব অভিযোগের বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বক্তব্য জানতে প্রতিবেদক শনিবার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।

প্রকৃত ভূমিহীনদের ঘর কি ফিরবে?

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে কেনাবেচার সুযোগ থাকলে সরকারের পুনর্বাসন উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা পুনঃপরীক্ষা, অবৈধভাবে হাতবদল হওয়া ঘর শনাক্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সাভার-আশুলিয়ার আশ্রয়ণ প্রকল্পের এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে—কতটি ঘর প্রকৃত গৃহহীনদের হাতে রয়েছে, কতটি ঘর হাতবদল হয়েছে এবং এর পেছনে কারা সক্রিয়।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা