শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ সাভারে এমপির নির্দেশে মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ

সাধারণ নাগরিকদের আহ্বান

সাভারে এমপির নির্দেশে মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ

ফাহাদ-ই-আজম, সাভার : সাভারকে মাদকমুক্ত করতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। নিজ নিজ এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এই ঘোষণার পরই সামনে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মাদকবিরোধী অভিযানে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে? আর পুলিশের সোর্স পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি নিরীহ মানুষকে হয়রানি বা মাদক মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করে, তার জবাবদিহি করবে কে?

শুক্রবার ( ৪-সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সাভার সরকারি কলেজ মাঠে পৌর বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন সালাউদ্দিন বাবু।

তিনি বলেন, সাভারের মাটিতে কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকসেবীর স্থান হবে না। শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর না করে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নিজ নিজ এলাকার চিহ্নিত মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের ধরে সরাসরি পুলিশে দিতে হবে। এর আগে নির্বাচনী প্রচারণাতেও মাদক নির্মূলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে মাদকবিরোধী লড়াইয়ের পাশাপাশি উঠে এসেছে ভয়াবহ কিছু অভিযোগ। স্থানীয় নাগরিকদের একাংশের অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আগে পুলিশের হাতে আটক হওয়া কিছু ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। পরে সেই পরিচয়কে ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এসব কথিত সোর্সের কেউ কেউ পুরোনো অপরাধজগতের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে পুলিশের কাছে তথ্য সরবরাহের নামে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছেন। প্রতিপক্ষকে মাদক মামলায় জড়ানো, নিরীহ ব্যক্তিকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা স্থানীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে কাউকে পুলিশের নজরে আনার মতো অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ আরও গুরুতর হয় যখন পুলিশের সোর্স পরিচয়টি নিজেই হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন ব্যক্তি সত্যিই পুলিশের তথ্যদাতা কি না—সেটি যাচাইয়ের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা আছে কি না। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে আটক বা মামলা দেওয়া হলে সেই তথ্য কতটা যাচাই করা হয়, সেটিও প্রশ্নের মুখে।

একজন সচেতন নাগরিকের অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে সাভার নাগরিক কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো নাগরিক মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে ওই ব্যক্তি পরে জামিনে বের হয়ে প্রতিশোধ নিলে সেই নাগরিকের পাশে কে দাঁড়াবে? মাদকবিরোধী অভিযানে মানুষকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোরদের ব্যবহার করার প্রবণতাও উদ্বেগজনক। কিশোরদের দিয়ে তথ্য সংগ্রহ বা অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে ব্যবহার করা হলে তাদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা কিংবা অপরাধী চক্রের প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে শিশু-কিশোরদের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এদিকে সাভার-আশুলিয়ায় নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান ও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাদকসহ গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, শুধু মাদকসহ বাহক বা খুচরা বিক্রেতা গ্রেপ্তার করলেই কি মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? মাদকের উৎস, অর্থের প্রবাহ, পাইকারি সরবরাহকারী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা হচ্ছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। রাজনৈতিক কর্মী বা সাধারণ নাগরিকের হাতে আইন তুলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এমপির মাদকবিরোধী নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সাভার পৌর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইব্রাহিম মোল্লার সভাপতিত্বে সভাটি পরিচালনা করেন পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান বদি। সভায় সাভার ও আশুলিয়া থানা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

মাদকমুক্ত সাভারের ঘোষণা তাই শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে যাতে কোনো নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, পুলিশের সোর্স পরিচয়ের আড়ালে কেউ যাতে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে না পারে এবং মাদক ব্যবসার মূল হোতারা যাতে ধরাছোঁয়ার বাইরে না থাকে, এসব বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা