কক্সবাজার থেকে রিয়াজ উদ্দিন : কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে সার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা। আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়া, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি এবং সীমান্তপথে কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এতে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।
টেকনাফের হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, সার কেনার জন্য ডিলারের দোকানে গিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না তাঁরা। কেউ অল্প পরিমাণ সার পেলেও বড় জমির তুলনায় তা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। আবার কেউ একাধিক দোকানে ঘুরেও সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে বেশি দামে সার কেনার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কৃষক।
হ্নীলার পানখালী এলাকার কৃষক খলিল আহমদ চলতি আমন মৌসুমে ৪৫ কানি জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, জমিতে দেওয়ার জন্য সার সংগ্রহ করতে গিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। একই উপজেলার হোয়াইক্যং এলাকার কৃষক সরোয়ার আলম প্রায় চার একর জমিতে আমনের চারা রোপণ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না।
হোয়াইক্যংয়ের আরেক কৃষক হোছন ১০ কানি জমিতে চাষাবাদ করেছেন। তাঁর দাবি, ডিলারের কাছ থেকে একবারে ১০ থেকে ১৫ কেজির বেশি সার দেওয়া হচ্ছে না। হ্নীলার মরিচ্যাঘোনা এলাকার কৃষক জহির বৈদ্য ১০ কানি জমির জন্য মাত্র ১০ কেজি সার পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ছোট লেচুয়াপ্রাং এলাকার কৃষক সিরাজ মিয়া পাঁচ কানি জমিতে আমনের চারা রোপণ করলেও প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
হোয়াইক্যংয়ের কম্বনিয়াপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুস শুক্কুর সার না পেয়ে জমি পরিত্যক্ত রাখার কথা বলেছেন। একই এলাকার কৃষানি নুরুন্নাহার জানিয়েছেন, তিন কানি জমিতে আমন ধান ও এক কানি জমিতে অন্যান্য ফসল চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত ১৫ কেজি সার পেয়েছেন তিনি।
রইক্ষ্যং পুটিবনিয়া এলাকার কৃষক কিউ চিং চা চাকমা ছয় কানি জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সার সংকটের কারণে সময়মতো জমিতে সার দিতে পারেননি। স্থানীয়ভাবে কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দরে সার কেনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ
কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকা দরে বিক্রির নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ইউরিয়া ও টিএসপি বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৬৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৪৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, প্রকৃত বিক্রয়মূল্য এবং ডিলারদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সীমান্তপথে সার পাচারের অভিযোগ
টেকনাফের সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে সার পাচারের অভিযোগও গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার বিভিন্নভাবে পাচারকারীদের হাতে পৌঁছানোর পর মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে পাচারের সময় কোস্ট গার্ড ও বিজিবির হাতে সার জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি ১০ থেকে ২০ কেজির বস্তায় সার পাচারের ঘটনাও ধরা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ছোট পরিমাণে সার সংগ্রহ করে তা অন্য বস্তায় ভরে সেলাই করে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হচ্ছে।
তবে পাচারের সঙ্গে কারা জড়িত, কী পরিমাণ সার পাচার হয়েছে এবং জব্দ হওয়া চালানের সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ও তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।
সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে মাদক বাংলাদেশে প্রবেশের কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। তবে সার পাচারের সঙ্গে মাদক প্রবেশের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত, মাঠে কেন সংকট?
মাঠপর্যায়ে কৃষকের সার না পাওয়ার অভিযোগের বিপরীতে জাতীয় পর্যায়ে সার মজুত ও সরবরাহের হিসাব ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ৬ সেপ্টেম্বর দেশে মোট ১২ লাখ ২২ হাজার টন সার মজুত ছিল। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার ধরনের সারের চাহিদা ধরা হয়েছে ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন। বিপরীতে সম্ভাব্য সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে ৫৩ লাখ ৭১ হাজার টন।
জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ পরিকল্পনায় ঘাটতি না থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চাহিদা নিরূপণ, ডিলার পর্যায়ে বিতরণ, মজুত, পরিবহন, অতিরিক্ত দামে বিক্রি কিংবা সীমান্তপথে পাচারের কোনো একটি কারণে স্থানীয় বাজারে সরবরাহে সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
টেকনাফে বাড়তি ৭০ টন ইউরিয়ার চাহিদা
টেকনাফে সার সংকটের অভিযোগ অবশ্য পুরোপুরি স্বীকার করছে না উপজেলা প্রশাসন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সার মনিটরিং কমিটির সভাপতি এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘টেকনাফে সার সংকটের বিষয়টি মোটেও সত্য নয়।’ তবে হ্নীলা ও হোয়াইক্যংসহ উপজেলায় নতুন করে ১১০ হেক্টর লবণ মাঠে ধানের আবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত ৭০ টন ইউরিয়া সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে।
