শনিবার | অক্টোবর ৩, ২০২৬
প্রচ্ছদ ভ্রমণ কথা বলে যে মসজিদ—পাকেরহাটের প্রাচীন ‘আওকরা মসজিদ’

কথা বলে যে মসজিদ—পাকেরহাটের প্রাচীন ‘আওকরা মসজিদ’

জাহাঙ্গীর খান বাবু : দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার পাকেরহাট থেকে গুচ্ছগ্রাম পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই প্রধান সড়কের পূর্ব পাশে চোখে পড়ে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এক প্রাচীন স্থাপনা—হাসিমপুর আওকরা মসজিদ। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি শুধু একটি পুরোনো মসজিদ নয়; বরং শত শত বছরের ইতিহাস, লোককথা আর ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য ঐতিহ্য।

স্থানীয়দের দাবি, ১৭৬৬ সালে মির্জা লাল ব্যাগ নামে এক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন। সে হিসাবে স্থাপনাটি আড়াই শতকেরও বেশি পুরোনো। চিকন ইট ও এটেল মাটি দিয়ে নির্মিত মসজিদটির নির্মাণশৈলী আজও কৌতূহল জাগায়। আধুনিক যুগের রড-সিমেন্টের ব্যবহার ছাড়াই সে সময়ের নির্মাণকৌশলে গড়ে ওঠা স্থাপনাটি প্রাচীন স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।

মসজিদটির নাম ‘আওকরা’ হওয়ার পেছনেও রয়েছে চমকপ্রদ এক জনশ্রুতি। স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত আছে, একসময় মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বললে সেই আওয়াজ ভেতর থেকে শোনা যেত। আবার ভেতর থেকে বলা কথা বাইরে থেকেও শোনা যেত বলে দাবি করেন অনেকে। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া সেই কাহিনি থেকেই মসজিদটির নাম হয়ে যায় ‘আওকরা মসজিদ’—অর্থাৎ যে মসজিদ কথা বলে।

এ নিয়ে অবশ্য বৈজ্ঞানিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার চেয়ে লোকবিশ্বাসই বেশি প্রচলিত। মসজিদের নির্মাণশৈলী, দেয়ালের গঠন ও শব্দ প্রতিফলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য থেকেই এমন অভিজ্ঞতা হয়ে থাকতে পারে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন। তবে শত বছর ধরে চলে আসা এই গল্পই মসজিদটির পরিচয়ের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে মুসলিম বসতির শুরুর দিকের অন্যতম স্মারক এই মসজিদ। একসময় গাছগাছালিতে ঘেরা ও প্রায় জনমানবহীন পরিবেশে পড়ে থাকা স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে ছিল জরাজীর্ণ অবস্থায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের আগ্রহও বাড়তে থাকে।

প্রাচীন স্থাপনাটির ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে কয়েক বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে তালিকাভুক্ত করে। এরপর শুরু হয় সংস্কার কার্যক্রম। তবে সংস্কারের মাধ্যমে স্থাপনাটির মূল নির্মাণশৈলী ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য কতটা অক্ষুণ্ন রাখা যাচ্ছে, সেটিই এখন স্থানীয়দের আগ্রহের বিষয়।

আওকরা মসজিদকে ঘিরে রয়েছে আরও নানা লোকবিশ্বাস। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে, কেউ কোনো সমস্যা বা মানত নিয়ে এখানে এসে নফল নামাজ আদায় করলে তার নিয়ত পূরণ হয়। এই বিশ্বাস থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মসজিদটিতে আসেন। ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহাসিক কৌতূহল—দুইয়ের মিলনে ধীরে ধীরে স্থানটি হয়ে উঠছে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র।

একসময় যেখানে ছিল নির্জনতা, এখন সেখানে দেখা যায় মানুষের আনাগোনা। মসজিদকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি গড়ে উঠেছে একটি রেস্টুরেন্ট ও ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে বিকেলের দিকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষের উপস্থিতি বাড়ে। কেউ আসেন মসজিদ দেখতে, কেউ আসেন প্রার্থনা করতে, আবার কেউ আসেন কয়েক শত বছরের পুরোনো স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে সময়ের সাক্ষী হতে।

পাকেরহাটের ব্যস্ত সড়ক থেকে সামান্য দূরেই দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ যেন অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন। এর ইট, মাটি আর দেয়ালের ভাঁজে লুকিয়ে আছে আড়াই শতকের ইতিহাস। আর ‘কথা বলে’ মসজিদটির সেই কিংবদন্তি আজও মানুষের কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসা পুরোনো এই স্থাপনাটি এখন সংস্কারের মাধ্যমে নতুন করে মানুষের সামনে আসছে। তবে সংস্কারের পাশাপাশি এর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য, প্রাচীন নির্মাণশৈলী ও স্থানীয় লোককথাগুলোও সংরক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করেন এলাকাবাসী। কারণ আওকরা মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়—এটি পাকেরহাটের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের স্মৃতিরও অংশ।

বহু বছর পর পাকেরহাটের পথে ফিরে এসে ইতিহাসের সেই নীরব সাক্ষী ‘আওকরা মসজিদ’-এর সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, চারপাশ বদলেছে—কিন্তু কয়েক শতাব্দী পেরিয়েও সেই পুরোনো মসজিদটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার নিজস্ব গল্প নিয়ে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা