শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ তীব্র গ্যাস সংকট

তীব্র গ্যাস সংকট

সফিকুল ইসলাম: তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে চালু থাকা স্টেশনগুলোতে ভোর থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। গ্যাস নিতে চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে বাসাবাড়িতে রান্না বিঘ্নিত হচ্ছে, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে গ্যাস সংকটে ক্রমাগত ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরে বসবাসরত সকল পেশা-শ্রেনির মানুষ। শুধু নগরবাসীই নয়, গ্যাস সংকটে গাজীপুর-সাভার ও নারায়ণগঞ্জে শিল্প কারখানায় উৎপাদনে ধস নেমেছে।
জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীতে তীব্র থেকে আরও তীব্র হচ্ছে গ্যাস সংকট। এতে গৃহস্থালির পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাস নিয়ে হাহাকার। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভাড়ায় চালিত গাড়ি চালকরা। তবে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, এলএনজি সরবরাহ নির্বিঘ্ন হলে এ সংকট কেটে যাবে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তীব্র গ্যাস সংকট রাজধানীবাসী। ভোর থেকে রাত অবধি বাসা বাড়িতে গ্যাসের অভাবে রান্নায় বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও কোথাও একেবারেই চাপ কম থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে নগরবাসী। গ্যাস পাম্পগুলোতেও বেড়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার সারি। ঢাকা ও আশেপাশে সিএনজি পাম্পগুলোতে গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কয়েকটি পাম্পে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্যাস সংকটে সিএনজিচালিত পরিবহন খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে শুধু উৎপাদনই নয়, রফতানি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, এমনকি সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। তাদের দাবি, দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ শিল্প-কারখানা বর্তমানে আংশিক বা পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধের অবস্থায় রয়েছে। দেশে প্রতিদিন গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি সব খাতেই গ্যাসের চাপ কমে গেছে। তবে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বিদেশি প্রকৌশলীরা টার্মিনাল মেরামতের কাজ চালিয়ে গেলেও কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট সময় বলা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন লাগতে পারে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, বর্তমানে দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত শুধু গ্যাস সংকটেই নয়, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটেও রয়েছে। তিনি বলেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চললে কার্যকর মূলধন শেষ হয়ে যাবে এবং বহু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না। তিনি বলেন, শিল্প সচল না থাকলে সরকারের কর ও ভ্যাট আদায়ও কমে যাবে। তাই শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক স্টিল মিল কার্যত উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। গ্যাসের সংকট দীর্ঘ হলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রফতানি— সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। আগে যেখানে শিল্প এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ পিএসআই চাপ পাওয়া যেত, এখন অনেক জায়গায় তা ২০ থেকে ২৫ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে। নরসিংদী, আশুলিয়া ও গাজীপুরের কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। আর জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সমস্যা শুধু একটি এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি নয়; বরং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। গত কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ছয় বছরে দেশীয় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ফলে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যেকোনও একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় কোনও অতিরিক্ত সক্ষমতা বা বিকল্প ব্যবস্থা নেই। তাই একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই শিল্প খাতসহ পুরো অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারছেন না চালকরা। আবার কোথাও কোথাও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে গিয়ে দিনের বড় একটি সময় নষ্ট হচ্ছে। এতে কমেছে তাদের দৈনিক আয়, বেড়েছে ভোগান্তি। সোমবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের হতাশার কথা জানা গেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কোনো কোনো স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ধীরগতিতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে একটি গাড়িকে গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক চালক গ্যাস না পেয়ে স্টেশন থেকে ফিরে যাচ্ছেন।
চালকরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে একদিকে যেমন তাদের আয় কমেছে, অন্যদিকে যাত্রীদেরও ভোগান্তি বেড়েছে। দীর্ঘ সময় সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষা করার কারণে অনেক চালক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না। ফলে যাত্রীদেরও বাড়তি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক মহিদুল বলেন, আগে গ্যাস নিতে এত সময় লাগত না। এখন ২/৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই সময়টায় গাড়ি চালাতে পারলে আয় করতে পারতাম। কিন্তু গ্যাসের জন্য বসে থাকতে হচ্ছে। দিন শেষে আয় অনেক কমে গেছে। আজিমপুর এলাকার সিএনজি চালিত অটোচালক মহব্বত বলেন, অনেক সময় গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। তখন অন্য স্টেশনে যেতে হয়। সেখানে আবার নতুন করে লাইন। এতে জ্বালানি খরচও বাড়ে, আয়ও কমে। শাহবাগে চালক তোফায়েল বলেন, আগে দিনে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় করতে পারতাম। এখন ১ হাজার টাকা ইনকাম করাই কঠিন। তবে দৈনিক জনতার সম্পাদক ওবায়দুর রহমান শাহীনের ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার চালক রিফাত হোসেন জানান, গত রোববার রাত সাড়ে ৮টায় মুগদা বিশ্বরোড এলাকার শান্ত সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়াই এবং অনেক কষ্টে রাত ২টা ১৫ মিনিটে ৪ শত টাকার গ্যাস পেয়েছি। তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় মাঝে মাঝেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল প্রেশার সুইচ। এদিন রিফাত হোসেনের মতো শত শত চালক লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজন মতো গ্যাস নিতে পারেনি। তিনি থাকেন আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন এর আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের ৬ নাম্বার রোডের বাসায়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আগামী সপ্তাহে যদি তারা (এক্সিলারেট এনার্জি) যেটা এক্সপেক্টেড, যদি ৫০ শতাংশ সাপ্লাই রিস্টোর করতে পারে, তারপরের সপ্তাহে শতভাগ রিস্টোর করতে পারবে। এটাই এখন পর্যন্ত প্ল্যানিং। তাদের স্টেটমেন্ট অনুযায়ী বলছি, তাদের তথ্যের ওপর কিন্তু দিন-তারিখ সুনির্দিষ্টভাবে আমরা বলছি না। কারণ এর আগেও যে দিন-তারিখ দিয়েছে, বিভিন্ন কারণে সেটা তারা পালন করতে পারেনি। সোমবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা জানান। দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় গ্যাসের (এলপিজি ও সিএনজি) তীব্র সংকটে নাগরিকদের চরম ভোগান্তির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একইসঙ্গে চলমান সংকট দ্রুত নিরসনে সরকারের প্রতি দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে দলটি। সোমবার এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

 

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা