বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ দুদকে ফাইল চাপা: স্মার্ট টেকনোলজিসের ১২ হাজার কোটি টাকার অর্থপাচার ও শুল্ক ফাঁকির অনুসন্ধান দুই বছরেও হিমাগারে, নেপথ্যে কারা?

দুদকে ফাইল চাপা: স্মার্ট টেকনোলজিসের ১২ হাজার কোটি টাকার অর্থপাচার ও শুল্ক ফাঁকির অনুসন্ধান দুই বছরেও হিমাগারে, নেপথ্যে কারা?

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনঃ নামে-বেনামে সনি (SONY) ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী এবং নিজস্ব “স্মার্ট” ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানির আড়ালে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ও ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুই বছর ধরে ঝুলে আছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। দেশের এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন তদবির ও “ম্যানেজ” প্রক্রিয়ার কারণে এই মেগা দুর্নীতির অনুসন্ধান ফাইলটি পুরোপুরি হিমাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সাথে রহস্যজনক কারণে দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোও এই বিশাল কেলেঙ্কারির ফলোআপ নিউজ প্রকাশ থেকে বিরত রয়েছে, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও সন্দেহের উদ্রেক করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান কমিশনার বরাবর স্মার্ট টেকনোলজিস (BD) Ltd.-এর বিরুদ্ধে একটি যুগান্তকারী ও চাঞ্চল্যকর লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মিথ্যা ঘোষণা, আন্ডার ইনভয়েসিং, হুন্ডি ব্যবসা, এবং সরকারি বিভিন্ন খাতের শত শত কোটি টাকার টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছিল। অভিযোগ দাখিলের পর দেশের দুই-একটি জাতীয় দৈনিকে প্রাথমিক সংবাদ প্রকাশিত হলেও, গত দুই বছরে আর কোনো ফলোআপ বা অগ্রগতি চোখে পড়েনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত সরকারের শীর্ষ রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক পুলিশ প্রধান এবং সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়াসহ শীর্ষ কর্তাদের সরাসরি আশকারা ও প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে এই টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও এই অপরাধ চক্রের শিকড় এতটাই গভীরে যে, বর্তমান নীতি-নির্ধারণী মহলও রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
স্মার্ট টেকনোলজিসের টেন্ডার বাণিজ্য ও রাজস্ব ফাঁকির চালচিত্রঃ
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, স্মার্ট টেকনোলজিস বিগত ২৫ বছর ধরে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সিসি ক্যামেরা, এলইডি টিভি ও অডিও-ভিডিও সামগ্রী বিক্রয় করেছে। কিন্তু তাদের বাৎসরিক হিসাব বিবরণীতে প্রকৃত বিক্রয়ের চেয়ে অবিশ্বাস্য রকমের কম অংক দেখানো হয়েছে। মূলত ভ্যাট এবং ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই দ্বৈত হিসাব বা অফ-দ্য-রেকর্ড ব্যবসা পরিচালনা করা হতো। সবচেয়ে বড় জালিয়াতিটি করা হয়েছে আমদানির ক্ষেত্রে। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কাস্টমসে মাত্র ৩০% মূল্য দেখিয়ে এলসি খোলা হতো। বাকি ৭০% টাকা বা প্রায় ৩,১২৫ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারত, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরব থেকে সিঙ্গাপুর (STARSEED TECHNOLOGIES PTE LTD) ও দুবাইয়ে (Simal Technologies Middle East LLC) অবস্থিত স্মার্ট টেকনোলজিসের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে পাচার করা হতো।
বিদেশে সম্পদের পাহাড়: মালিকদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বিলাসী জীবনঃ
অভিযোগে স্মার্ট টেকনোলজিসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের দুবাই ও সিঙ্গাপুরে থাকা অবৈধ সম্পদের সুনির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই দুই ভাই-ই কড়া গোপনীয়তায় বাংলাদেশী পাসপোর্ট এর পাশাপাশি টার্কিশ (তুরস্ক) পাসপোর্ট ধারণ করে দ্বৈত নাগরিকত্ব ভোগ করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অনুমতি ছাড়াই তারা বিপুল পরিমাণ ডলার হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করেন। সিঙ্গাপুরে ও দুবাইয়ে তাদের রয়েছে বহু মিলিয়ন ডলারের বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি ও ফ্ল্যাট। এছাড়াও পরিচালক মোহাম্মদ তানভীর হোসেন ও এজিএম মোহাম্মদ জুবায়ের হোসেনের বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদের বিবরণ রয়েছে।
দুদকের ধীরগতিঃ
অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তানভীর আহমেদ এর সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি তার হটসআপ নাম্বারে পরিচয় দিয়ে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি তার কোন উত্তর দেননি। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমস, ভ্যাট ও অডিট বিভাগকে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে চুপ করিয়ে রেখেছেন বলেও বাজারে চাউর রয়েছে। অথচ এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নির্ভরযোগ্য সূত্রে যোগাযোগ করা হলে তারা স্পষ্ট জানান, স্মার্ট টেকনোলজিসের বিরুদ্ধে আনা শুল্ক ফাঁকি ও অর্থপাচারের অভিযোগটির অনুসন্ধান এখনো চলমান রয়েছে এবং এর কোনো পরিসমাপ্তি ঘটেনি।
যদি অনুসন্ধান চলমানই থাকে, তবে গত দুই বছরে কেন কোনো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ বা দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হলো না? কেন এই বিশাল দুর্নীতির হোতাদেরকে গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো না? দেশের ক্রান্তিলগ্নে যখন ডলার সংকটে অর্থনীতি বিপর্যস্ত, তখন হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারীদের এভাবে ফ্রিস্টাইল সুবিধা দেওয়া দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম ব্যর্থতা ও দুর্নীতির সাথে আপসের শামিল। একই সাথে, গণমাধ্যমগুলোর এই নীরবতা “কর্পোরেট ম্যানেজমেন্টের” এক কালো অধ্যায়কে নির্দেশ করে। দেশের সচেতন মহল অনতিবিলম্বে এই ফাইলটি সচল করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা