শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধিঃ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে মরা মুরগি বিক্রির অভিযোগ তুলে ধরার পর তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও হেনস্তা চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সভা করেছেন নারী সাংবাদিক রুমানা আক্তার শিপা। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেল ৪টায় শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাবে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় জানানো হয়, শ্রীমঙ্গলের নতুনবাজার এলাকার ‘ফ্যামিলি বাজার’-এ (পরিচালনায় বিসমিল্লাহ পোল্ট্রি হাউস) মরা মুরগি বিক্রির অভিযোগ এনে ভিডিওসহ তথ্য-প্রমাণ দিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন রুমানা আক্তার শিপা। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে অধিদপ্তর।
জরিমানার পর গত ১৫ আগস্ট শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. মাসুমুর রশিদ মাসুম। ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্যকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে রুমানা আক্তার শিপার বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক সুনাম নষ্টের অভিযোগ তোলেন। বৃহস্পতিবারের প্রতিবাদ সভার আয়োজকদের দাবি, ওই সংবাদ সম্মেলনে মরা মুরগি থাকার বিষয়টি স্বীকার করা হলেও দায় চাপানো হয় কর্মচারীদের ওপর, আর সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি মাধ্যমে রুমানা আক্তারের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য প্রচার করা হয়, যা একজন নারী সাংবাদিককে সামাজিকভাবে হেনস্তা ও মানহানির শামিল।
প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে রুমানা আক্তার শিপা বলেন, “আমি সমাজের সচেতন নাগরিক ও একজন সংবাদকর্মী হিসেবে শুধু মানুষের অধিকার ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সত্য তুলে ধরেছি। অথচ দুঃখজনকভাবে আমার সত্য প্রকাশের বিপরীতে একশ্রেণির সংবাদকর্মী ওই ব্যবসায়ীর পক্ষ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়েছেন। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”
চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিন্দুমাত্র সত্যতা যদি কেউ প্রমাণ করতে পারেন, তবে আমি ওই প্রতিষ্ঠানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা দিব। সত্য কখনো ঢাকা থাকে না। আমি চাই সাংবাদিক ভাইয়েরা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আসল সত্য উন্মোচন করুন এবং সত্যের পক্ষে কলম ধরুন।”
সভায় উপস্থিত থেকে একাত্মতা প্রকাশ করেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি শামীম আক্তার, সাধারণ সম্পাদক বিকুল চক্রবর্তী, সিনিয়র সহসভাপতি চৌধুরী ভাস্কর হোম, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সহসভাপতি ও সাপ্তাহিক সুরমার ঢেউ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী শ. ই. সরকার জবলু, হিউম্যান রাইটস রিভিউ সোসাইটির মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি মো. জিতু তালুকদার প্রমুখ। এ ছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সত্যের লড়াইয়ে রুমানা আক্তার শিপার পাশে থাকার আশ্বাস দেন এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
তবে ১৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে মাসুমুর রশিদ মাসুম মরা মুরগি বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, অতিরিক্ত গরম বা বিরূপ আবহাওয়ায় বিক্রয় প্রক্রিয়া চলাকালে কখনো কখনো দু-একটি মুরগি মারা যেতে পারে এবং কর্মচারীরা সেগুলো বিক্রিযোগ্য মুরগি থেকে আলাদা করে রাখেন; কিছু মানুষ গৃহপালিত কুকুরের খাবার ও চিড়িয়াখানার পশুখাদ্য হিসেবে স্বল্প মূল্যে কর্মচারীদের কাছ থেকে ওই মৃত মুরগি নিয়ে যান, যা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার অংশ নয়। দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেছেন উল্লেখ করে ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর কোনো বক্তব্য না নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়েছে, যাতে তাঁর ব্যবসায়িক সুনাম ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ২৫ বছর ধরে শ্রীমঙ্গলে ব্যবসা করছেন জানিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁর সুনাম নষ্ট করতে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন।
এদিকে পাল্টাপাল্টি এই দুই সংবাদ সম্মেলনের পর স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে, এ ধরনের ঘটনায় প্রচলিত আইনে কার কী অধিকার এবং কোন প্রতিকার কোথায় মেলে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ২৬ নং আইন)-এর ধারা ৭৬(১) অনুযায়ী, যে কোনো ব্যক্তি—যিনি সাধারণভাবে একজন ভোক্তা বা ভোক্তা হইতে পারেন—ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কার্য সম্পর্কে মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। তবে আইনের ধারা ৬০ অনুযায়ী, কারণ উদ্ভব হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ না করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। ধারা ৭৬(৬)-এ আরও বলা হয়েছে, যে কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনো পণ্যের নকল বা ভেজালের বিষয়টি সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা বা গবেষণাগারে পরীক্ষা করিয়ে ফলাফলসহ অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী হয়, তা-ও আইনে সুনির্দিষ্ট। ধারা ৭৬(৩) অনুযায়ী মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দোষী ব্যক্তির ওপর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জরিমানা আরোপ করতে পারেন, এবং ধারা ৭৬(৪) অনুযায়ী আদায় করা জরিমানার ২৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারীকে দিতে হয়—তবে অভিযোগকারী অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বা কর্মচারী হলে তিনি ওই অর্থ পাবেন না। অর্থাৎ অভিযোগ করে জরিমানার অংশ পাওয়া আইনেরই স্বীকৃত বিধান; এটি একা কোনো অভিযোগকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ প্রমাণ করে না।
জরিমানার আইনি চরিত্রটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ধারা ৭০(১) অনুযায়ী, চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলেও অধিদপ্তর সমীচীন মনে করলে দণ্ড আরোপ না করে এবং ফৌজদারি মামলা না করে কেবল জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল বা ব্যবসা স্থগিতের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারে। ধারা ৭০(২) অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ অর্থদণ্ডের বেশি জরিমানা করা যায় না, ধারা ৭০(৩) অনুযায়ী জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ড আরোপ করা যায় না এবং ধারা ৭০(৪) অনুযায়ী দোষী ব্যক্তিকে অনূর্ধ্ব পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হয়। ফলে প্রশাসনিক জরিমানা পরিশোধ করা আর আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক জিনিস নয়। জরিমানার আদেশে ঠিক কোন ধারায়, কী কারণে দণ্ড আরোপ হয়েছে—সেই আদেশনামাই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত দলিল।
খাদ্যপণ্য-সংক্রান্ত অপরাধে ওই আইনে একাধিক দণ্ডবিধান রয়েছে। ধারা ৪১ অনুযায়ী জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। ধারা ৫২ অনুযায়ী আইন বা বিধির বিধিনিষেধ অমান্য করে সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে এমন কাজ করলে এবং ধারা ৫৩ অনুযায়ী কোনো সেবা প্রদানকারী অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতার মাধ্যমে সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটালেও একই মাত্রার দণ্ডের বিধান রয়েছে। ধারা ৫৫ অনুযায়ী একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ দণ্ড প্রযোজ্য হয়। আইনের ধারা ৫৯ অনুযায়ী এ আইনের সব অপরাধ জামিনযোগ্য, আমলযোগ্য ও আপসযোগ্য।
আবার আইনে অব্যাহতির বিধানও আছে। ধারা ৭৮(১) অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘনজনিত কোনো কাজের সঙ্গে বিক্রেতার জ্ঞাতসারে সংশ্লিষ্টতা না থাকলে তাঁকে দায়ী করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। ধারা ৭৮(৪)-এ বলা হয়েছে, কাঁচা মাছ বা শাক-সবজির মতো দ্রুত পচনশীল কোনো পণ্য স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণে পচে যাওয়া অবস্থায় কোনো দোকানে পাওয়া গেলে সেই কারণে দোকানদারকে দায়ী করে ফৌজদারি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না—যদি না সহজেই বোধগম্য হয় যে, পচে গেছে জেনেও তিনি তা বিক্রয়ের জন্য রেখেছেন বা বিক্রির চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ এ ধরনের ঘটনায় নির্ণায়ক প্রশ্নটি হলো—জেনেশুনে বিক্রয়ের উদ্দেশ্য ছিল কি না।
ফৌজদারি পথটিও আইনে বাঁধা। ধারা ৭১(১) অনুযায়ী ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কার্যের অভিযোগে সরাসরি প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করা যায় না; অভিযোগ দিতে হয় মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। ধারা ৬৫ অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের রায় বা আদেশে সংক্ষুব্ধ পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে দায়রা জজ আদালতে আপিল করতে পারেন। এর পাশাপাশি ধারা ৬৬ অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করে নিরূপিত ক্ষতির সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ৪৩ নং আইন)-এর আওতাতেও পড়ে, যার প্রয়োগকারী সংস্থা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং যেখানে অপরাধের বিচারের জন্য খাদ্য আদালতের ব্যবস্থা রয়েছে। ওই আইনের ধারা ৫৪ অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক লিখিত নোটিশ দিয়ে খাদ্যব্যবসার উৎস-শনাক্তকরণ (traceability) সংক্রান্ত জমা-খরচের বহি, রশিদ ও দলিলপত্র চাইতে পারেন এবং নোটিশপ্রাপ্ত ব্যক্তি তা দিতে বাধ্য থাকেন। ধারা ৫৫ অনুযায়ী পরিদর্শকের বিশ্বাস করার কারণ থাকলে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, অনুপযোগী বা ভেজাল বস্তু ও তা দিয়ে প্রস্তুত খাদ্যদ্রব্য জব্দ করা যায়; ধারা ৫৬ অনুযায়ী দ্রুত পচনশীল ও মানুষের খাদ্য হিসেবে অনুপযোগী হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা যায়, আর ধারা ৫৭ অনুযায়ী ধ্বংস করা সম্ভব না হলে বিষয়টি এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপন করে বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংসের নির্দেশ নিতে হয়। এই কাঠামোই বলে দেয়, বিক্রয়কেন্দ্রে মারা যাওয়া মুরগি কোথায় গেল, তার হিসাব রাখা খাদ্যব্যবসায়ীর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
অন্যদিকে কোনো ব্যবসায়ী যদি মনে করেন তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা বা হয়রানিমূলক, তাঁরও প্রতিকার রয়েছে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনের ধারা ৫৪ অনুযায়ী, কোনো ব্যবসায়ী বা সেবা প্রদানকারীকে হয়রানি, জনসমক্ষে হেয় করা বা তাঁর ব্যবসায়িক ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায়ে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করলে দায়েরকারী অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রেও প্রমাণের দায় অভিযোগ উত্থাপনকারীর, এবং তা প্রমাণ করতে হয় উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ও আদালতের কাছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা সংবাদ সম্মেলনে নয়। একইভাবে, কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ‘জরিমানা’ করতে পারেন না; জরিমানা আরোপের এখতিয়ার কেবল আইনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ও আদালতের।
মানহানির প্রশ্নটি এ ঘটনার দ্বিতীয় বড় দিক। বাংলাদেশে মানহানি এখনো মূলত দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৯ ধারায় সংজ্ঞায়িত এবং ৫০০ ধারার অধীন ফৌজদারি অপরাধ, যেখানে দোষী সাব্যস্ত হলে দুই বছর পর্যন্ত সাধারণ কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এর পাশাপাশি দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলাও করা যায়। অনলাইন প্রচারের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো সম্প্রতি বদলেছে—বহুল বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এ অনলাইনে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচার আলাদা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো; ২০২৫ সালে ওই আইন রহিত করে জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে বাদ পড়া ধারাগুলোর মধ্যে মানহানি-সংক্রান্ত ধারাটিও ছিল। বর্তমানে কার্যকর আইন সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৮১ নং আইন), যা ওই অধ্যাদেশ রহিত করে পুনঃপ্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের ধারা ২৮-এ মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ দায়েরের অপরাধ ও দণ্ড এবং ধারা ৩০-এ ক্ষতিপূরণের আদেশ দানের ক্ষমতা-সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। কোন ঘটনায় কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা ঘটনার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে; সেই সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই যুক্তিসংগত।
সাংবাদিকতার দিক থেকেও কয়েকটি নীতিগত প্রশ্ন এ ঘটনায় স্পষ্ট। অনিরাপদ খাদ্যের অভিযোগ অনুসন্ধান করা সাংবাদিকের কাজের বৈধ পরিসরের মধ্যেই পড়ে এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা প্রকাশে আইনি বাধা নেই। কিন্তু অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য না নিয়ে একতরফা প্রচার—তা ব্যক্তির বিরুদ্ধে হোক বা প্রতিষ্ঠানের—সাংবাদিকতার নীতিমালার লঙ্ঘন এবং মানহানির ঝুঁকি তৈরি করে। এই মানদণ্ড অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত, উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।
সব মিলিয়ে আইনি কাঠামোটি স্পষ্ট: খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ করার অধিকার প্রত্যেক ভোক্তার আছে, ব্যবসায়ীর আছে আত্মপক্ষ সমর্থন ও মিথ্যা অভিযোগের প্রতিকার চাওয়ার অধিকার, আর কারও বিরুদ্ধে মানহানিকর প্রচার চালানো হলে তারও আলাদা প্রতিকার রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিকারের একটিও পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলনে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলে না—মেলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও আদালতে। ভোক্তার আসল উদ্বেগও কে সত্যবাদী তা নয়, বরং বাজারে যে মুরগি বিক্রি হচ্ছে তা নিরাপদ কি না। সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে পারে কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি ও স্বচ্ছ তদন্ত।
