বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ দুর্নীতির অভিযোগ, বদলি, আবার পুনর্বহাল’ শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা এস এম শামীম আকতারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, অসংগতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

দুর্নীতির অভিযোগ, বদলি, আবার পুনর্বহাল’ শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা এস এম শামীম আকতারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, অসংগতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা এস এম শামীম আকতারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতিসহ একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমিতে দায়িত্ব পালনের সময় এসব অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।

প্রাপ্ত নথির তথ্যে দেখা যায়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তত পাঁচবার বিদেশ সফর করেছেন এই কর্মকর্তা এবং দীর্ঘ সময় উপপরিচালকের চলতি দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ সংবাদপত্রে উঠে আসে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নামে সুবিধাভোগীকে দেওয়া ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা, বিভিন্ন কর্মসূচিতে বেনামি চেকের মাধ্যমে ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ‘দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ’ কর্মসূচির বরাদ্দ থেকে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অন্যতম।

অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বেনামী সম্পদের পাহাড়ঃ অভিযোগে আরো জানা যায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচনে আইন লঙ্ঘন করে নিজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসানো হয়েছিল। একই সঙ্গে গবেষণা, শিল্পীদের সম্মানী আটকে রাখা এবং নিজের নামে প্রকাশিত একটি নৃতাত্ত্বিক বইয়ের লেখকত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। রাজশাহী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা বেনজামিন টুডুও আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে একাডেমি সভাপতি ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
শুধু প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মই নয়, ক্ষমতার দাপট ও অনৈতিক উপায়ে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তার নিজস্ব তিনটি ফ্ল্যাট, দুটি প্লট এবং কোটি টাকার ওপর এফডিআর (FDR) রয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি একটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। এছাড়া বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের সাবেক স্ত্রীকে নির্মম নির্যাতনের পর তালাক প্রদান করেন। ভুক্তভোগী নারী আইনি আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলেও সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের সঙ্গে শামীমের ঘনিষ্ঠতা থাকায় কোনো সুবিচার পাননি।
অফিসে অনুপস্থিতি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গঃ
আর্থিক অনিয়ম ও ব্যক্তিগত ক্ষমতার অপব্যবহারের পাশাপাশি কর্মস্থলে নিয়মিত অনুপস্থিতির বিষয়টিও নথিতে রয়েছে। কর্মস্থলে বারবার অনুপস্থিত থাকায় একাডেমির সচিব তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছিলেন। একই সময়ে উপপরিচালক হিসেবে চলতি দায়িত্বে থেকেও সহকারী পরিচালকের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার মতো দ্বৈত আচরণ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বদলির পর রাজনৈতিক সুপারিশে পুনর্বহালঃ ২০১৭ সালে এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তাকে রাজশাহী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একাডেমি থেকে সরিয়ে ঢাকায় মূল পদে ফেরত আনা হয়। তবে রাজশাহী-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এবং তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী কে এম খালিদের সুপারিশে তাকে আবারো স্বস্থানে প্রভাবশালী পদে বহাল করা হয়। পরবর্তীতে তাকে পুনরায় গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগে উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
প্রতিযোগিতায় স্বজনপ্রীতি ও অডিও বিতর্ক ২০২১ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি। অভিযোগ উঠে, বিজয়ী ২২ জনের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই একাডেমির কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ ও শামীমের স্বজন। যদিও একাডেমি কর্তৃপক্ষ ও শামীম আকতার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে ১২ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের একটি অডিও রেকর্ডও রয়েছে, যেখানে এক নারীকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব, হুমকি ও ব্যক্তিগত চাপের বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়।
পট পরিবর্তন ও বর্তমান তৎপরতাঃ
গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে শামীম আকতারের ভূমিকা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিগত সরকারের সমস্ত সুবিধা ভোগ করার পর, রাতারাতি নিজেকে বিএনপি সমর্থক হিসেবে জাহির করতে তিনি উপরমহলে জোর লবিং শুরু করেছেন। তার আদি নিবাস সিরাজগঞ্জ হওয়া সত্ত্বেও বগুড়ার স্থানীয় পরিচয় ব্যবহার করে এবং তারেক রহমানের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্তের বক্তব্য ও রহস্যজনক মুঠোফোন বার্তাঃ
এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত এস এম শামীম আকতারকে মুঠোফোনে লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়ে উত্তর চাওয়া হলে তিনি মুঠোফোনে দাবি করেন, এগুলো অনেক পুরনো বিষয়। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি তার পক্ষে রিপোর্ট দিয়েছে এবং তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তবে সেই রিপোর্টের কপি চাওয়া হলে তিনি বলেন, কপিটি অনেক পুরনো হওয়ায় বর্তমানে তার কাছে নেই।
পরবর্তীতে নামসর্বস্ব একটি ক্রাইম রিপোর্টার সংস্থার তথাকথিত সভাপতি পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি নিজেকে শামীম আকতারের বন্ধু হিসেবে দাবি করেন। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “শামীম আকতার বগুড়ার লোক। তাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়োগ দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে নিউজ না করে এসব তথ্য যারা সরবরাহ করেছে, প্রতিবেদক যেন তাদের বিরুদ্ধে নিউজ প্রকাশ করে।”
জবাবদিহি ও তদন্তের দাবিঃ
প্রাপ্ত নথিতে ২০১৩ থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কারণ দর্শানোর নোটিশ, সংবাদ প্রতিবেদন এবং সর্বশেষ লিখিত অভিযোগের বিবরণ রয়েছে। এত অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসংগতির পরও তিনি কীভাবে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা