শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ জাতীয় ‘স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’ : রাষ্ট্রপতি

‘স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’ : রাষ্ট্রপতি

স্টাফ রিপোর্টার : স্বাধীন বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাদের বিচারের আওতায় এনে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।

বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করেন তিনি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা তাদের পরিবারগুলোর প্রতিও গভীর সহমর্মিতা জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম শুধু একজন ব্যক্তিকে নিখোঁজ করে না; এর প্রভাব পুরো পরিবারের জীবন, স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের ওপর পড়ে।

গুমকে সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এর মাধ্যমে একজন নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা একই সঙ্গে ক্ষুণ্ন হয়।

বিগত দেড় দশকে দেশে গুম এবং গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর ভয়াবহ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভিন্নমত প্রকাশ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের কারণে অনেক মানুষকে তুলে নিয়ে গোপনে আটকে রাখা ও হত্যার অভিযোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন।

এ সময় গুমের শিকার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম ও সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গুম ও গোপন আটকের বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি জানান, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ বা মৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন এবং ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন গুমের ঘটনা তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি। গুম বন্ধে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপনের কথাও জানান তিনি।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তার মতে, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক কষ্টের মধ্যে থাকা পরিবারগুলোর চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে ভয়ের পরিবেশ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংবিধান ও আইনের অধীন থাকবে এবং নাগরিকদের মানবাধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বিচার করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং তার নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছেন—সেটিই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

সবশেষে রাষ্ট্রপতি দৃঢ়ভাবে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা