বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজাসহ নানা মাদক। যা জনজীবন ও যুবসমাজকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলো মাদকের মূল রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলার সীমান্ত পয়েন্টগুলো দিয়ে সহজে মাদক পারাপার হয়। সক্রিয় চোরাচালান চক্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়ায় তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীরা আসক্ত হয়ে পড়ছে। চুরি, ছিনতাই ও হানাহানির মতো সামাজিক অপরাধ বেড়ে গেছে। যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত রুটগুলোতে (যেমন সাতক্ষীরার শ্যামনগর, দেবহাটা, কালীগঞ্জ) ফেনসিডিল ও ইয়াবার চালান বেশি আসছে। সাম্প্রতিক এক অভিযানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সাতক্ষীরা সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৩২ কোটি টাকার অবৈধ মাদকদ্রব্য ধ্বংস করেছে, যা এই রুট দিয়ে বড় চালান প্রবেশের প্রমাণ দেয়। দুর্গম সীমান্ত ও নদীপথ ব্যবহার করে পাচারকারীরা খুব সহজেই আইনকে ফাঁকি দিচ্ছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি এসব মাদকের একটি বড় অংশ ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে। কুরিয়ার সার্ভিস ও ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যম ব্যবহার করে বর্তমানে মাদক ব্যবসার কৌশল পাল্টানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও মাদকে সয়লাব খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট জেলাগুলো। হাত বাড়ালেই তৃণমূলের সর্বত্রই পাওয়া যাচ্ছে মাদক। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ী আটকসহ জব্দ করা হচ্ছে মাদক। বেশি ধরা পড়ছে বিদেশি মদ, গাজা, ইয়াবাসহ অন্যান্য দ্রব্য।
জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ নাজুক হয়ে পড়ে। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মতৎপরতাও বেশ কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। এই সুযোগে সমাজে মাদক ব্যবসা জেকে বসে। আর্থিকভাবে লাভবান হতে নারীরাও মাদক ব্যবসায় সক্রিয় হয়ে পড়েন। এখন আর আগের মতো রাতে পুলিশি টহল এবং মাদকপাচারের রুটগুলোতে চৌকি বসানো হচ্ছে না। যে কারণে সর্বত্র মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। অতিষ্ঠ হয়ে এলাকার বিক্ষুব্ধ মানুষ পাড়া-মহল্লায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে সভা-সমাবেশসহ এলাকায় বিক্ষোভ করছেন। এ ছাড়া জনসমাগম স্থানে মাদকবিরোধী ব্যানার টানিয়ে দিচ্ছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের গণধোলাই শেষে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বাড়ি-ঘর ভাঙচুরসহ আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও নানা জটিল কারণে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সীমান্তবর্তী রুট দিয়ে চোরাচালান অব্যাহত থাকা, মূল গডফাদারদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এবং মাদকের বিশাল চাহিদা। প্রতিবেশী দেশ ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন রুট দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল এবং আইসের মতো ভয়ানক মাদক নিয়মিত প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুচরা বিক্রেতা বা বাহকদের গ্রেপ্তার করলেও অনেক সময় মূল গডফাদাররা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বেকারত্ব ও মাদকের উচ্চ চাহিদা সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ বন্ধ হতে দেয় না।
খুলনাঞ্চলে মাদকদ্রব্যের ব্যাপক বিস্তার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ফলে যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে এবং অপরাধমূলক কর্মকা- বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদক। পাড়া-মহল্লায় মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য ও আধিপত্য বিস্তার। মাদক ব্যবসা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুনোখুনি, মারামারি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্ম আসক্ত হয়ে পড়ছে। সন্ধ্যা নামলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো: সাজ্জাদুর রহমান বলেন, খুলনায় ইয়াবার আগ্রাসন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। ব্যবসায়ীরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। পুলিশ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের অভিযান চালিয়েও এদের নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, খুলনায় বেকার সমস্যাই ইয়াবা ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করেছে। ইয়াবা ব্যবসায় লাভ বেশি তাই বেকার যুব সমাজ এই ব্যবসায় নামছেন। পুলিশ কমিশনার বলেন ইয়াবা নয়; সকল মাদক ব্যবসা নির্মুলে পুলিশ কাজ করছে।
খুলনার বিশিষ্ট নাগরিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইয়াবার মরণছোবল থেকে এ অঞ্চলকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা। সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু মহলের ওপর অভিভাবকদের কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। একই সাথে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তথ্যনির্ভর ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করে খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি মূল অর্থ জোগানদাতা ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যুবসমাজকে রক্ষা করতে না পারলে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতি হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
