বি এম রাকিব হাসান, খুলনা : যান্ত্রিক ত্রুটি, চিকিৎসক ও জনবল সংকট এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে খুলনার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কিডনি ডায়ালাইসিস ও হৃদরোগের চিকিৎসায় সংকট সবচেয়ে তীব্র। সেবা নিতে আসা সাধারণ রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক সংকটে ফেলছে। আর হাসপাতালের ভর্তির সিরিয়াল পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় রোগীদের। ফলে সুচিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ।
খুলনা নগরীর গোয়ালখালী এলাকায় তিনটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই হাসপাতাল। এর নাম ছিল শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর হাসপাতালটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল। বর্তমানে এ হাসপাতালে ১১টি বিভাগ চালু রয়েছে। ৮৫ জন চিকিৎসক, ২০০ জন নার্স এবং ১০৩ জন সহায়ক কর্মচারী দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ১০ টাকার টিকিট কেটে সেবা নিচ্ছেন। যেখানে রয়েছে কার্ডিওলজি বিভাগ সিসিইউ, পোস্ট সিসিইউ, গাইনি, নিউরোলজি, নেফ্রোলজি, ইউরোলজি, অর্থপেডিক্স মেডিসিন, ডায়াবেটিস, নিউরো মেডিসিন, মেডিসিন, ফিজিওথ্যারাপি, নিউরো সার্জারি, হোমো ডায়ালাইসিস, দন্ত বিভাগ, বার্ন এন্ড প্লাস্টিক ইউনিটসহ ইনটেনসিভ কেয়ার আইসিইউ সাপোর্টের ব্যবস্থা।
এক সময় যা গরীব অসহায় মানুষের জন্য এ সব ব্যয়বহুল চিকিৎসা ছিল শুধুই স্বপ্ন। পাশাপাশি মুমূর্ষু রোগীদের জন্য কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য মনিটর, আলট্রাসনো, সিটিস্কান, এমআরআই, ইকো, ইটিটি, ইসিজি, ইটিটি, ডক শর্ট দেওয়ার ব্যবস্থাসহ কার্ডিয়াক মনিটর, লাইফ সাপোর্ট ভেন্টিলেটার ও স্বল্প খরচে প্যাথলজি পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে। হাসপাতালটিতে গরীব অসহায় রোগী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোনো টাকা নেওয়া হয় না। এ ছাড়া স্বল্প খরচে এমআরআই, এক্স-রে, সিটিস্ক্যান, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ইকোসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা রয়েছে। তবে এত সব থাকলেও তদারকি ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার রোগীরা এসব সেবা থেকে বঞ্চিত।
খুলনার বিশেষায়িত হাসপাতালের বেশিরভাগ ডায়ালাইসিস মেশিন দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। সচল মেশিনের সংখ্যা কম থাকায় কিডনি রোগীদের লম্বা সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। হৃদরোগের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যেমন- এনজিওগ্রাম বা হার্টে রিং পরানোর মেশিন দীর্ঘদিন অকেজো থাকায় সেবা বন্ধ। খুলনার বিশেষায়িত হাসপাতালসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র অভাব রয়েছে। বহির্বিভাগে টিকিট কেটেও অনেক সময় সেবা না পেয়ে ফিরতে হয়। অনেক সময় জরুরি প্যাথলজি পরীক্ষা ও ওষুধের সংকটে রোগীকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়।
হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটের চিত্র এখন বিষণœ। এক সময় যেখানে প্রতিটি শয্যায় রোগী থাকতো, এখন অর্ধেকের বেশি শয্যা খালি। এক বছরের বেশি সময় ধরে যান্ত্রিক ত্রুটি ও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে বেশিরভাগ মেশিন। বর্তমানে সচল আছে মাত্র ১৩টি ডায়ালাইসিস মেশিন।
শুধু কিডনি বিভাগ নয়, হৃদরোগ চিকিৎসাতেও রয়েছে চরম সংকট। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বিকল ক্যাথল্যাব মেশিনের কারণে বন্ধ রয়েছে এনজিওগ্রাম এবং হার্টে রিং পরানোর মতো জরুরি সেবা। এর বাইরে প্যাথলজি বিভাগেও প্রয়োজনীয় রি-এজেন্ট ও ব্লাড লাইন সরবরাহে ঘাটতির কারণে মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরীক্ষা।
হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ একটি সি-আর্ম মেশিন প্রায় এক বছর ধরে নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। এই মেশিনের মাধ্যমে বিভিন্ন অপারেশন পরিচালিত হতো। মেশিনটি অচল থাকায় সংশ্লিষ্ট অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। জানতে চাইলে হাসপাতালের বায়োমেডিকেল টেকনোলজিস্ট পলক কুমার রায় জানান, সফটওয়্যার সমস্যার কারণে মেশিনটি অচল হয়ে পড়ে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে একটি প্রতিনিধিদল এসে পরিদর্শন করে। তবে পুরোনো মডেলের হওয়ায় এর সফটওয়্যার সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ভাসকুলার সার্জারি, বার্ন ইউনিট ও নিউরো মেডিসিন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া সহায়ক কর্মচারীরও অভাব রয়েছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৫০০-৬০০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে জনবল এবং যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ।
এছাড়া খুলনা অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র সংকট রয়েছে। কিডনি (নেফ্রোলজি), ক্যান্সার (অনকোলজি) এবং স্নায়ুরোগ (নিউরো মেডিসিন) বিভাগের মতো বিশেষায়িত বিভাগগুলোতে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায় না। হাসপাতালের আল্ট্রাসনোগ্রাম, ডিজিটাল এক্স-রে ও ইসিজি মেশিনগুলো অনেক সময় নষ্ট থাকে। আইসিইউ (ওঈট) ও ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে হয়। যাদের সামর্থ্য নেই তারা সময়মতো সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় মালপত্র সংরক্ষণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্টোররুম নেই। ফলে বিভিন্ন কক্ষে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম রাখতে হচ্ছে, যা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। এ ব্যাপারে পরিচালক জানান, একটি স্টোর বিল্ডিং নির্মাণ করা গেলে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে। এদিকে ২৫০ বেডের হাসপাতাল হলেও বর্তমানে চালু রয়েছে ২১৬টি। বাকি ৩৪টি বেড অকেজো রয়েছে। ফলে রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. শেখ আবু শাহীন বলেন, আমরা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানিয়েছি। কিন্তু কোনো কার্যকর সমাধান আসছে না। এতে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তবে আমরা আশা করি দ্রুত এর সমাধান হবে। অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির উন্নয়ন ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর ততদিন পর্যন্ত কষ্ট, দুর্ভোগ আর প্রতীক্ষাই হবে রোগীদের নিত্যসঙ্গী।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দাবি, নবনির্বাচিত সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালের জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকর করবে।
