# ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট ৬৩৪ শয্যাবিশিষ্ট
# আধুনিক হৃদরোগ হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় রয়েছে ২ হাজার
# এটি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৭৮ সালে জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল মালিক
# অসচ্ছল রোগীদের জন্য বিশেষ ছাড় ও বিনামূল্যে সেবার ব্যবস্থা রয়েছে
সফিকুল ইসলাম: হার্টের রিং পরানো, বাইপাস সার্জারিসহ হৃদরোগের আন্তর্জাতিক অত্যাধুনিক মানের সেবা এখন দেশেই পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। এতে আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি হয়রানিও কমেছে তাদের। হৃদরোগীদের চাহিদার একটি বড় অংশই পূরণ করছে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ। অপেক্ষাকৃত স্বল্পমূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ মানসম্মত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই দেশের সাধারণ মানুষের বিশেষ আস্থা অর্জন করেছে বেসরকারি এ স্বাস্থ্যসেবা দেয়া প্রতিষ্ঠানটি। তবে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য হৃদরোগের চিকিৎসা অনেক সময় ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে গরীবে ভরসা হার্ট ফাউন্ডেশন। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সীট সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছেন রোগীরা।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট ৬৩৪ শয্যাবিশিষ্ট।
আধুনিক হৃদরোগ হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় রয়েছেন ২ হাজারের বেশি কর্মকর্তা কর্মচারি। মিরপুর-২ ও দারুস সালাম রোডে অবস্থিত হাসপাতালটিতে সাধারণ শয্যার পাশাপাশি মহিলাদের ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত কার্ডিয়াক ইউনিট রয়েছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন এক লাখ ৩৮ হাজার ৪৯০ জন। একই সময়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন তিন লাখ ৭৮ হাজার ২৪৪ জন। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮১ হাজার ৮৪১ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫,৫৫২ জন। এর আগের বছর ২০২৫ সালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন এক লাখ ৮৯ হাজার ৭০৩ জন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই লাখ ২৭ হাজার ৫০৬ জন। আর ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ২১ হাজার ৩১৯ জন। মারা গেছেন ৭,৩৪৮ জন। ২০২৪ সালে জরুরি বিভাগে এক লাখ ৭০ হাজার ৮৯৭ জন, বহির্বিভাগে দুই লাখ ৭২ হাজার ২৬০ জন, ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ৭,২১৫ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৭,১৪৭ জন। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে প্রায় ৪০টি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার হচ্ছে। হৃদরোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় এনজিওগ্রাম, স্টেন্ট (রিং) স্থাপন, বাইপাস সার্জারি ও ক্যাথল্যাবের মতো সুবিধা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে এসব চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। আবার বেসরকারি পর্যায়ে খবচ সরকারি হাসপাতালের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। আর্থিকভাবে সচ্ছল রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য নেই তাদের মোট রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশই এই হাসপাতালে সেবা নেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ করে দিতে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়। ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হৃদরোগ বিষয়ক সচেতনতামূলক আলোচনা, চিকিৎসা পরামর্শ এবং অসচ্ছল রোগীদের সহযোগিতা। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে দরিদ্র মানুষের জন্য হৃদরোগের চিকিৎসা আরও সহজলভ্য করা সম্ভব। মানবিক এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে অসংখ্য অসচ্ছল মানুষ উপকৃত হবে এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা আরও বৃদ্ধি পাবে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবাকে সহজলভ্য করার প্রত্যয়ে গরীবে ভরসা হার্ট ফাউন্ডেশন ভবিষ্যতেও তাদের মানবিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের চিকিৎসা সময়নির্ভর হওয়ায় রোগীকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সীট সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে শয্যা ও চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা আসছেন হার্ট ফাউন্ডেশনে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অনেকেই জানিয়েছেন, হৃদরোগের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছি। চিকিৎসার খরচ নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। এখানে এসে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে পেরেছি। চিকিৎসাসেবা পেয়ে আমি সন্তুষ্ট। হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা নিতে আসা কিশোরগঞ্জের মানিক জানান, শারীরিক সমস্যা নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানে আসলে এনজিওগ্রাম করে ব্লক ধরা পড়ে। হার্ট ফাউন্ডেশনে স্বল্প খরচে রিং পরাতে পেড়েছি। এখানে চিকিৎসক-নার্স ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের ব্যবহারও অনেক ভালো। অসীম নামে আরেক রোগী জানান, আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য হৃদরোগের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন। হার্ট ফাউন্ডেশনে এসে চিকিৎসকদের পরামর্শ পেয়েছি এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়েছি। এখানকার সেবায় আমরা আশাবাদী। বিক্রমপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন হোসনে আরা বলেন, হৃদরোগের চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের সবাই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এখানে চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়ায় আমাদের অনেকটা স্বস্তি এসেছে। রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসক ও কর্মীদের আচরণও ভালো। তবে কয়েকজন রোগী চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করা, অপেক্ষার সময় কমানো এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, হৃদরোগের চিকিৎসা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় নিয়মিত ফলোআপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সহজ করা প্রয়োজন। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রত্যাশা, হার্ট ফাউন্ডেশনের সেবার পরিধি আরও বাড়বে এবং দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের জন্য হৃদরোগের চিকিৎসা আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।
হাসপাতালের কর্মরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হৃদরোগ বর্তমানে আমাদের দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। হার্ট ফাউন্ডেশনে আমরা প্রতিদিন রোগীদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি হৃদরোগ প্রতিরোধ ও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছি। রোগীদের প্রতি আমাদের পরামর্শ—বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কথা হয় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী এর সঙ্গে। তিনি বলেন, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে বুকের মাঝখানে তীব্র ব্যথা অন্যতম। এ ব্যথা ধীরে ধীরে চোয়াল, বাম কাঁধ বা হাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, মাথা ঘোরা কিংবা হৃদরোগের অন্য কোনো সতর্কসংকেত দেখা দিলে তা কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। হাসপাতালটিতে কর্মরত নার্সরা বলছেন, রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় সেবা, ওষুধ প্রয়োগ এবং মানসিকভাবে সাহস জোগানোর কাজ করে থাকি। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করি। রোগীর সঙ্গে আন্তরিক আচরণ এবং যত্নের মাধ্যমে তাঁদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার পথে সহযোগিতা করাই আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।
