শনিবার | অক্টোবর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ সরাইলে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, এবার ৫৫ মণ্ডপে উৎসব

রং-তুলির আঁচড়ে দেবী দুর্গার রূপ ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পীরা :

সরাইলে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, এবার ৫৫ মণ্ডপে উৎসব

সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) থেকে মোঃ রাকিবুর রহমান রকিব: দুয়ারে কড়া নাড়ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসবকে বরণ করে নিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় এখন সাজ সাজ রব। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্রতিমা নির্মাণ, রং-তুলির শেষ আঁচড়, সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পী, পূজা উদযাপন কমিটি ও আয়োজকেরা।

এ বছর সরাইল উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে মোট ৫৫টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

মণ্ডপে মণ্ডপে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা
উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ স্থানেই প্রতিমা নির্মাণের মূল কাজ শেষ পর্যায়ে। বাঁশ, খড় ও মাটির কাঠামোয় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা। কোথাও চলছে প্রতিমায় রং লাগানোর কাজ, কোথাও আবার দেবীর পোশাক, অলংকার ও সাজসজ্জায় ব্যস্ত কারিগরেরা।

প্রতিমার চোখ, মুখ ও অলংকরণের নিখুঁত কাজগুলোতে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছেন শিল্পীরা। তাঁদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় মাটির প্রতিমা যেন ধীরে ধীরে জীবন্ত রূপ পাচ্ছে। প্রতিটি মণ্ডপেই এখন উৎসবের প্রস্তুতি ঘিরে বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য।

মায়ের প্রতিমা গড়তে ক্লান্তি নেই শিল্পীদের সরাইল সদর এলাকার কালীবাড়িতে প্রতিমা তৈরির কাজে নিয়োজিত এক শিল্পী বলেন, “মায়ের প্রতিমা তৈরির কাজ করতে আমার খুব ভালো লাগে। মায়ের রূপ অন্তরে ধারণ করে কাজ করি। তাই ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত পরিশ্রম করলেও ক্লান্তি অনুভব করি না। চেষ্টা করি, যেন প্রতিটি প্রতিমা নিখুঁত ও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারি।”

দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় যুক্ত কারিগরদের কাছে প্রতিমা নির্মাণ শুধু জীবিকা নয়, বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্য ও শিল্পসাধনার অংশ।

উপকরণের দাম বাড়ায় চাপে আয়োজক ও শিল্পীরা

উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি এবার বাড়তি ব্যয়ের চাপও অনুভব করছেন আয়োজক ও প্রতিমাশিল্পীরা। রং, খড়, বাঁশ, মাটি ও লোহাসহ প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণ ব্যয় আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

দীর্ঘ ২০ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগরেরা জানান, উপকরণের দাম বাড়লেও সে অনুপাতে তাঁদের পারিশ্রমিক বাড়েনি। ফলে পরিশ্রমের তুলনায় লাভ কম হচ্ছে। তবুও ঐতিহ্যবাহী এই পেশার প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

সরাইল কালীবাড়ির পুরোহিত স্বাধীন চক্রবর্তী বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দুর্গাপূজার সার্বিক ব্যয় অনেক বেড়েছে। বাড়তি খরচ সামলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের আয়োজন সম্পন্ন করতে হচ্ছে।

প্রস্তুতি প্রায় শেষ, সুষ্ঠু উদযাপনের প্রত্যাশা
সরাইল উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দেবদাস সিংহ রায় বলেন, “পূজা উদযাপন কমিটি ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। মণ্ডপগুলোতে ধর্মীয় রীতিনীতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় অনেকেই ব্যক্তিগত অনুদান দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করছি, এবারও অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মোঃ একরামুজ্জামান কবির ও পূজা উদযাপন পরিষদের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৫৫টি মণ্ডপে পূজা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা পুলিশের
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের পূজামণ্ডপগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপন নিশ্চিত করতে পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। পূজা সুন্দর, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রতিমার শেষ মুহূর্তের কাজ, মণ্ডপের সাজসজ্জা ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি ঘিরে সরাইলজুড়ে বইছে শারদীয় উৎসবের আবহ। আয়োজক ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হবে এবারের দুর্গোৎসব।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা