শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ শো’কজ ছাড়াই অব্যাহতি, ত্যাগীদের সরিয়ে ‘আওয়ামী দোসরদের’ প্রাধান্য: শ্রীমঙ্গল বিএনপি নেতা তাজুর অভিযোগ

শো’কজ ছাড়াই অব্যাহতি, ত্যাগীদের সরিয়ে ‘আওয়ামী দোসরদের’ প্রাধান্য: শ্রীমঙ্গল বিএনপি নেতা তাজুর অভিযোগ

শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধিঃ দলীয় সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত আর্থিক দেনা-পাওনা নিয়ে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাজি মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে মতবিরোধ থাকায় তাঁকে সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতেই উপজেলা বিএনপির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির অব্যাহতিপ্রাপ্ত যুগ্ম আহ্বায়ক মো. তাজ উদ্দিন (তাজু)। সংসদ সদস্যকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের মিথ্যা অজুহাতে আমাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় শ্রীমঙ্গলের একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ তাজ উদ্দিন তাজু। জেলা বিএনপির এ সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায় ও অগঠনতান্ত্রিক’ উল্লেখ করে তিনি তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে তাজ উদ্দিন অভিযোগ করেন, সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকে দলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, তাঁদের দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে পবিত্র রমজান মাসের ইফতার মাহফিলে যারা হামলা-মামলা করেছে, নির্যাতন করেছে, সেই আওয়ামী দোসররাই আজ সংসদ সদস্যের চারপাশে ঘিরে রেখেছে।’

অব্যাহতির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, গত ১৩ আগস্ট তাঁকে বাদ দিয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য জেলা বিএনপির কাছে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে কমিটির কয়েকজন সদস্য বিষয়টি তাঁকে জানান। তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওই রেজুলেশন পাস করা হয়েছে এবং কাউকে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাজ উদ্দিনের ভাষ্য, আহ্বায়ক তখন আক্ষেপ করে বলেছিলেন—যা হচ্ছে তা ঠিক হচ্ছে না, এভাবে চলতে থাকলে দলের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

তিনি আরও জানান, গত ১৬ আগস্ট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফয়জুল করিম ময়ূন ও সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে তাঁকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অথচ অব্যাহতির আগে তাঁকে কোনো শো’কজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি, তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে তা-ও জানানো হয়নি এবং কোনো সাংগঠনিক শুনানিতে তাঁকে ডাকা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। গণমাধ্যম ও দলীয় সূত্রে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান।

তাজ উদ্দিন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হলেও বিগত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে তাঁকে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকেই বিরত রাখা হয়েছে। বিষয়টি তিনি বিভিন্ন সময়ে জেলা বিএনপি এবং সিলেট বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতা সিদ্দিকীকে অবহিত করেছেন।

সংসদ সদস্যের সঙ্গে দূরত্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তিনি ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাজি মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনের দুই-তিন সপ্তাহ আগে দলীয় কিছু বিষয় ও তাঁর ব্যক্তিগত আর্থিক দেনা-পাওনা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। এরপর থেকেই তাঁকে সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা হয় বলে তাঁর অভিযোগ। এ বিষয়টি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও পৌর বিএনপির আহ্বায়কসহ কয়েকজনকে নিয়ে গিয়ে তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবকে অবহিত করেছেন বলেও জানান।

নিজের রাজনৈতিক পথচলার বর্ণনা দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, ২০০৬ সালে প্রয়াত প্রবীণ নেতা এম সাইফুর রহমানের হাত ধরে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর দলের আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে আসছেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির দুইবারের সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বশেষ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ৩০টির অধিক মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দায়ের করা হয় এবং এসব মামলায় বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৭২০ দিন তাঁকে কারাভোগ করতে হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও একাধিক মামলার শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সিলেট আগমন উপলক্ষে শ্রীমঙ্গলে স্বাগত মিছিল বের করা হলে পুলিশ হামলা চালিয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করে এবং নির্যাতনে তাঁর পা ভেঙে দেয়। পরে কারাগারে থাকা অবস্থায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে রেখে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এসব কর্মসূচিতে বর্তমান সংসদ সদস্যও সঙ্গে ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে দলীয় কাউন্সিল ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ‘পকেট কমিটি’ গঠনের চেষ্টা চলছে। কারও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের প্রভাবে ইচ্ছেমতো কমিটি গঠন করা হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য হাজি মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জানান, তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত কাজে সংসদে ব্যস্ত রয়েছেন। এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা