বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ বান্দরবানে দৈনিক জনতার পার্বত্য অঞ্চল প্রতিনিধি সম্মেলন ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় জনতার আস্থা অর্জনের আহ্বান

বান্দরবানে দৈনিক জনতার পার্বত্য অঞ্চল প্রতিনিধি সম্মেলন ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

বান্দরবান প্রতিনিধি: সত্য, বস্তুনিষ্ঠতা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে পাঠকের আস্থা অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও জাতীয় দৈনিক জনতার সম্পাদক ওবায়দুর রহমান শাহীন।

তিনি বলেছেন, “সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের প্রতি বড় একটি দায়িত্ব। একজন প্রকৃত সাংবাদিককে ভয়, প্রলোভন ও চাপের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।”

শুক্রবার বান্দরবানের হলিডে ইন রিসোর্টে আয়োজিত দৈনিক জনতার পার্বত্য অঞ্চল প্রতিনিধি সম্মেলন ও প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া দিনব্যাপী এ সম্মেলন শেষ হয় বিকেল ৩টায়।

দৈনিক জনতার বান্দরবান প্রতিনিধি ও প্রবীণ সাংবাদিক এম.এ. হাকিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পত্রিকার মফস্বল ইনচার্জ জাহাঙ্গীর খান বাবু।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, একটি সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে পাঠকের আস্থা ও বিশ্বাস। সেই আস্থা অটুট রাখতে হলে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের যথাযথ যাচাই, নিরপেক্ষতা ও সততা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ নয়, জনস্বার্থকে সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি করতে হবে।

তিনি বলেন, দ্রুত সংবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় ভুল, অসম্পূর্ণ কিংবা যাচাই-বাছাইহীন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। একটি ভুল সংবাদ শুধু একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে না, একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।

পার্বত্য অঞ্চলকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় জনপদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সমস্যা, সম্ভাবনা, উন্নয়ন, পরিবেশ ও পর্যটনের খবর জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে স্থানীয় সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও ভৌগোলিক প্রতিকূলতার মধ্যেও পার্বত্য অঞ্চলের সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালন করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিকূলতা সাংবাদিকতার পথে বাধা হতে পারে, দায়িত্ব পালনের অজুহাত হতে পারে না। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরতে হলে সাংবাদিকদের আরও সাহসী, দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভর হতে হবে।

দৈনিক জনতার ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রসঙ্গ তুলে ধরে সম্পাদক বলেন, দীর্ঘ পথচলায় পত্রিকাটি দেশের সংবাদপত্র জগতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু আনন্দ-উৎসবের উপলক্ষ নয়, বরং অতীতের অর্জন মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতের সাংবাদিকতাকে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকারের সময়।

তিনি পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধিদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে দৈনিক জনতার সংবাদমান, গ্রহণযোগ্যতা ও পাঠক আস্থা আরও বাড়বে।

‘গুজব নয়, যাচাই করা সত্য তুলে ধরতে হবে’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দৈনিক জনতার মফস্বল ইনচার্জ জাহাঙ্গীর খান বাবু বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের সাংবাদিকতার বাস্তবতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। পাহাড়ি অঞ্চলের সংবাদ সংগ্রহে নানা ধরনের বাস্তবতা ও সংবেদনশীলতা বিবেচনায় রাখতে হয়।

তিনি বলেন, কোনো ঘটনা বা অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে শুধু এক পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যও যথাসম্ভব সংবাদে তুলে ধরতে হবে। এতে প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

গুজবনির্ভর সংবাদ সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, গুজবকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ নয়, বরং গুজবের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরাই সাংবাদিকের দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, একটি উপজেলার মানুষের নাগরিক সমস্যা, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় নানা সংকট জাতীয় সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরার দায়িত্ব স্থানীয় প্রতিনিধিদের। দৈনিক জনতা তৃণমূলের মানুষের কথা বলার জায়গা হিসেবে কাজ করতে চায়।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলার প্রতিনিধিদের সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর খান বাবু বলেন, “আজ আমরা সবাই মিলে একটি পরিবার—দৈনিক জনতা পরিবার। এই পরিবারের সুখে-দুঃখে সবাইকে পাশে থাকতে হবে। দায়িত্বশীল ও পেশাদার সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে দৈনিক জনতাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে।”

‘৪০ বছর আগে পাহাড়ে সাংবাদিকতা ছিল কঠিন’

রাঙ্গামাটি থেকে আগত দৈনিক জনতার প্রবীণ সাংবাদিক হারুনুর রশিদ তার বক্তব্যে প্রায় চার দশক আগের পাহাড়ি অঞ্চলের সাংবাদিকতার কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণ করেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে মোবাইল সাংবাদিকতার কারণে মুহূর্তের মধ্যে সংবাদ ও ছবি পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু চার দশক আগে জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

তখন টেলিগ্রামে ইংরেজিতে সংবাদ লিখে পাঠাতে হতো। পরে সেই সংবাদ অফিসে অনুবাদ করে বাংলায় রূপান্তর করে প্রকাশ করা হতো। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত থাকায় সংবাদ সংগ্রহ ও পাঠানো ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তনে সাংবাদিকতা অনেক সহজ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

‘জনতার হাকিম চৌধুরী’

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও দৈনিক জনতার বান্দরবান প্রতিনিধি এম.এ. হাকিম চৌধুরী বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দৈনিক জনতার সঙ্গে যুক্ত। পত্রিকাটির প্রয়াত প্রকাশক সৈয়দ এম. আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে তিনি দৈনিক জনতায় যোগ দেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ এই সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ এলেও দৈনিক জনতা ছেড়ে কোথাও যাননি। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও মানুষের ভালোবাসার কারণে বান্দরবান অঞ্চলের মানুষ তাকে ‘জনতার হাকিম চৌধুরী’ নামে ডাকেন।

তিনি বলেন, একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক শুধু পেশাগত নয়; এর সঙ্গে আবেগ, ভালোবাসা ও দায়িত্বও জড়িয়ে থাকে। দৈনিক জনতার সঙ্গে তার দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিচারণ করে তিনি ভবিষ্যতেও পত্রিকার জন্য কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এর আগে সম্মেলনে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধিরা তাদের কাজের অভিজ্ঞতা, সমস্যা, সম্ভাবনা ও পেশাগত দায়িত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তব্য দেন।

সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক জনতার স্টাফ রিপোর্টার (কক্সবাজার) আব্দুল মতিন চৌধুরী, কক্সবাজার ব্যুরো চিফ রিয়াজ উদ্দিন, টেকনাফ প্রতিনিধি ফরহাদ রহমান, উখিয়া প্রতিনিধি আবু বক্কর সিদ্দিক, রামু প্রতিনিধি এইচ.এম. আলম, কুতুবদিয়া প্রতিনিধি এম. শহিদুল ইসলাম, লোহাগাড়া প্রতিনিধি দেলোয়ার হোসেন, পটিয়া প্রতিনিধি সেলিম চৌধুরী, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি নাজিমউদ্দিন, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি আলমগীর হোসেন, গুইমারা প্রতিনিধি আবুল বাশার, লংগদু প্রতিনিধি এরশাদ হোসেন, চট্টগ্রাম ডিজিটাল ইনচার্জ রুকশী শিকদার, কাপ্তাই প্রতিনিধি নূর মোহাম্মদ, লামা প্রতিনিধি শাহাবুদ্দিন, আলীকদম প্রতিনিধি শামীমুর রহমান জিসান, মাতামুহুরি থানা প্রতিনিধি ওমর ফারুকসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধিরা।

সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম উত্তর অঞ্চলের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। দিনব্যাপী আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে মাঠপর্যায়ে আরও দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও জনবান্ধব সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন দৈনিক জনতার প্রতিনিধিরা।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা