শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ বাবার হুমকি-গালাগালির পর ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়ল কিশোরী : মিফতাহুল জান্নাতের মৃত্যু

মোবাইল বার্তা, সিসিটিভি ও ছোট বোনের বক্তব্যে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ

বাবার হুমকি-গালাগালির পর ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়ল কিশোরী : মিফতাহুল জান্নাতের মৃত্যু

ফাহাদ-ই-আজম, নিজস্ব প্রতিবেদক : সাভারে পারিবারিক বিরোধের জেরে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও হয়রানির অভিযোগের মধ্যে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে মিফতাহুল জান্নাত শ্যামলী মণ্ডল নামে এক কিশোরী। মৃত্যুর আগে তাকে হুমকি ও গালাগালি দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগ করেছেন তার মা মৌসুমী। তাঁর দাবি, সাবেক স্বামী রিপন মণ্ডলের ধারাবাহিক হুমকি, গালাগালি, অপমান এবং মেয়েদের স্কুলের সামনে হয়রানির কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল মিফতাহুল জান্নাত শ্যামলী মণ্ডল।

পরিবারের ভাষ্য, ঘটনার আগের দিনও
মিফতাহুল জান্নাত শ্যামলী মণ্ডলের মোবাইল ফোনে হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। ওই বার্তা দেখার পর সে কান্নাকাটি করে এবং খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরদিন সকালে না খেয়েই স্কুলে যায়। স্কুল থেকে ফিরে হাসপাতাল কোয়ার্টারে গিয়ে একটি কক্ষে দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

পরিবারের দাবি, ঘটনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু আলামত পার্শ্ববর্তী সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে রয়েছে। তবে এসব আলামতের প্রকৃত তাৎপর্য তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

কিশোরীর মৃত্যুর কারণ নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে রয়েছে ভিন্নতা। মা মৌসুমী যেখানে সাবেক স্বামীর হুমকি ও মানসিক নির্যাতনকে দায়ী করছেন, সেখানে রিপন মণ্ডলের দাবি, তাঁর মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মায়ের কথিত পরকীয়ার বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। ফলে ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

দাম্পত্য কলহ থেকে বিচ্ছেদ :
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিপন মণ্ডলের সঙ্গে বিয়ের পর থেকেই মৌসুমীর দাম্পত্য জীবনে নানা অশান্তি চলছিল। রিপন সংসারের ব্যয় ঠিকমতো বহন করতে পারতেন না বলে দাবি মৌসুমীর। ফলে সরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত তাঁর আয়ের ওপরই অনেকটা নির্ভর করত সংসার। তাঁদের দুটি যমজ সন্তান রয়েছে।

এদিকে রিপন মণ্ডলের বিরুদ্ধে এলাকায় পরনারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও পরকীয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে বলে দাবি স্থানীয়দের। একপর্যায়ে তাঁকে পরনারীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবস্থায় এলাকাবাসী আটক করে মারধর করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে মুচলেকা দিয়ে তিনি ছাড়া পান বলে জানা গেছে। ওই ঘটনার একটি মুচলেকার কাগজ সংরক্ষিত রয়েছে বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের পাশাপাশি রিপনের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তি, নারীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক এবং সংসারে অভাব-অনটন নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলার অভিযোগও রয়েছে। একপর্যায়ে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

প্রাপ্ত তালাক নোটিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মৌসুমী রিপন মণ্ডলকে তালাকের নোটিশ দেন। ওই নোটিশের একটি কপিও পরিবারের কাছে রয়েছে।

দ্বিতীয় বিয়ে, এরপর বিরোধ আরও তীব্র :
বিবাহবিচ্ছেদের পর মৌসুমী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্স হিসেবে কর্মরত থাকাকালে একই হাসপাতালে চিকিৎসক ডা. আশরাফুল আলম আরিফের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। কর্মসূত্রে পরিচয় থেকে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে দুজনের সম্মতিতে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মুসলিম শরিয়াহ ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁদের বিয়ে হয় বলে জানা গেছে।

পরিবারের ভাষ্য, বিয়ের পর ডা. আরিফ মৌসুমীর আগের সংসারের দুই সন্তানের দায়িত্ব নেন এবং তাঁদের ভরণপোষণে সহযোগিতা করতেন।

এরপর থেকেই সাবেক স্বামী রিপন মণ্ডলের সঙ্গে বিরোধ আরও তীব্র হয় বলে অভিযোগ মৌসুমীর। তাঁর দাবি, রিপন বিভিন্ন সময়ে তাঁকে হুমকি ও গালাগালি করার পাশাপাশি দুই মেয়ের স্কুলের সামনে গিয়ে ভয়ভীতি দেখাতেন, মারধর করতেন এবং তাঁদের মাকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করতেন।

পরিবারের দাবি, এসব ঘটনার কিছু অংশের সমর্থন মিলতে পারে মোবাইল ফোনের বার্তা, স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ এবং নিহতের ছোট বোনের বক্তব্যে।

মৃত্যুর আগের দিনের বার্তা ঘিরে প্রশ্ন :
মৌসুমীর দাবি, মৃত্যুর আগের দিন মিফতাহুল জান্নাত শ্যামলীর মোবাইলে হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। বার্তাটি দেখার পর থেকেই সে কান্নাকাটি করছিল এবং খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পর বাড়িতে ফিরে সে হাসপাতালে কোয়ার্টারে যায়। পরে একটি কক্ষে দরজা বন্ধ করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়ে।

মৌসুমীর ভাষ্য, বাবার প্রতিনিয়ত হুমকি, গালাগালি ও অপমান সহ্য করতে না পেরেই আমার মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।

তবে ওই মোবাইল বার্তার বিষয়বস্তু, প্রেরকের পরিচয় এবং মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন চিকিৎসক আরিফ :
ডা. আশরাফুল আলম আরিফ বলেন, তাঁর সঙ্গে মৌসুমীর সাবেক স্বামী রিপন মণ্ডলের বিরোধ ছিল। বিভিন্ন সময়ে রিপন তাঁকেও মোবাইল ফোনে হুমকি দিতেন বলে দাবি করেন তিনি।

ঘটনার দিন নিজের অবস্থান সম্পর্কে ডা. আরিফ বলেন, সকালে ব্যক্তিগত কাজে তিনি সাভারের ব্র্যাক ব্যাংকে যান। পরে সাভারের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের শাখায় অবস্থান করেন। এরপর দুপুরে প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে থাকা বাসায় যান। সেখানে দুপুরের খাবার ও নামাজ শেষে বিকেলে সাভারের সেবা ক্লিনিক ও সিমা ক্লিনিকে যান। পরে হেমায়েতপুরের আলসিপা ক্লিনিকে রোগী দেখার সময় রাত ৯টার দিকে মৌসুমী তাঁকে ফোন করে মেয়ের আত্মহত্যার কথা জানান।

ডা. আরিফের দাবি, ঘটনার দিন তাঁর চলাচলের তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, ক্লিনিক ও এলাকার সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।

বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্য :
মৌসুমীর ভাষ্য, ডা. আশরাফুল আলম আরিফ তাঁর সঙ্গে হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকতেন না এবং সেখানে যাতায়াতও করতেন না। তিনি দুই যমজ মেয়েকে নিয়ে সেখানে থাকতেন। ডা. আরিফ তাঁর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে পৃথক ফ্ল্যাটে থাকতেন।

মৌসুমী আরও বলেন, তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কও অল্প সময়ের ছিল। পরে পারিবারিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে বিরোধের পর তাঁরা আলাদা হয়ে যান। তবে তাঁর ও মেয়েদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া এবং কেউ কাউকে হয়রানি না করার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল। এ কারণে ডা. আরিফের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই বলেও জানান মৌসুমী।

অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ, অস্বীকার রিপনের :
এদিকে ডা. আশরাফুল আলম আরিফের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে রিপন মণ্ডল কথিত অপসাংবাদিক ও ভুয়া টিকটকারদের ব্যবহার করে তাঁকে চাপ ও হয়রানি করেছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। এসব মাধ্যমে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনায় মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রিপন মণ্ডল।

রিপনের দাবি, তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করেনি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মায়ের কথিত পরকীয়ার বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তদন্তেই মিলবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ :
ঘটনাটি ঘিরে নিহতের মা ও বাবার পক্ষ থেকে থানায় পৃথক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন নিহতের মোবাইল ফোনের বার্তা ও কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, ছোট বোনের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন—সবকিছু মিলিয়ে তদন্ত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে মৃত্যুর আগে শ্যামলীর মানসিক অবস্থার ওপর কী ধরনের চাপ ছিল, তাকে কেউ হুমকি বা ভয়ভীতি দেখিয়েছিল কি না এবং ওই চাপ তাঁর মৃত্যুর সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, মেয়েটিকে আত্মহত্যার অবস্থায় পাওয়া গেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মেয়েটির মা ও বাবার পক্ষ থেকে পৃথক দুটি অভিযোগ থানায় পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তসহ তদন্তের পরই প্রকৃত কারণ এবং বাবার মানসিক চাপের কারণে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। ফলে শ্যামলীর মৃত্যু আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যার ঘটনা হলেও এর পেছনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্ত, ডিজিটাল আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণের পরই স্পষ্ট হবে—মৃত্যুর আগে কিশোরীর ওপর কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা নির্যাতন ছিল কি না এবং থাকলে তার সঙ্গে এই মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা