বি এম রাকিব হাসান, খুলনা : খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলে জলাবদ্ধতা এখন স্থানীয় মানুষের কাছে একটি ভয়াল দুর্যোগের নাম। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে টানা চার বছর ধরে বর্ষা মৌসুম এলেই এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ চরম মানবিক সংকটে পড়েন। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিলে প্রতি বছরই লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৩০ হাজার একরের বেশি চাষযোগ্য জমি বছরের দীর্ঘ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকে। এর ফলে বোরো ধান চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং শত শত চিংড়ি ঘের ও সবজি ক্ষেত ভেসে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
ঘরবাড়ির ভেতরে-বাইরে পানি উঠে যাওয়ায় বহু পরিবার বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোও পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় মানুষ চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বছরের অর্ধেক সময় পানির নিচে থাকে। চারিদিকে নোংরা ও দূষিত পানি জমে থাকায় এলাকায় চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
এদিকে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খাল খনন, উন্নয়ন প্রকল্প ও নানা প্রতিশ্রুতির পরও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, উন্নয়নের নামে প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু দুর্ভোগ কমেনি; বরং বিল ডাকাতিয়াকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক টানাপড়েন।
বারানসী থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত প্রধান সড়ক বছরের একটি বড় সময় পানির নিচে থাকছে। ফলে মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা এখন ডিঙি নৌকা। জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে খালপথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অসুস্থ রোগী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ বছর বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হলেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। অনেক পরিবার নিজ খরচে ভিটা উঁচু করায় বাড়িঘর প্লাবিত হয়নি, কিন্তু তলিয়ে গেছে অধিকাংশ রাস্তা। খালের ওপর নির্মিত কয়েকটি নিচু কালভার্টের কারণে নৌযান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দীর্ঘ পথ নৌকায় পাড়ি দেওয়াও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে না।
জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে বিল ডাকাতিয়ায় কোটি টাকার খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। স্থানীয়দের দাবি, আগে খনন করা খাল পুনরায় খননের পরিবর্তে মূল নদীগুলো খনন করা হলে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা হতো। কিন্তু সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও অনিয়মের কারণে প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি প্রকল্পের অব্যবহৃত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হয়েছে।
এদিকে বারানসী-কৃষ্ণনগর সড়কের কার্পেটিং কাজ দুই বছরেও শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। স্থানীয়দের মতে, শুধু সড়ক নির্মাণ নয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাস্তার উচ্চতা অন্তত দুই ফুট বাড়ানো জরুরি। কারণ বর্ষার মাঝামাঝি সময়েই সড়কটি পানির নিচে চলে যায় এবং জলাবদ্ধতা আগামী ফাল্গুন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
স্থানীয়রা বলেন, ভোটের আগে সবাই রাস্তা ও পানি নিষ্কাশনের প্রতিশ্রুতি দেয়। ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। বিল ডাকাতিয়াকে নিয়ে শুধু রাজনীতি হচ্ছে। বছরের পর বছর একই অবস্থা। আমরা যে কী দুর্ভোগে আছি, তা কেউ বুঝবে না। এভাবে পানিবন্দি হয়ে থাকার চেয়ে সরকার যদি অন্য কোথাও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করত, তাহলে হয়তো মুক্তি পেতাম। গ্রামবাসী নিজেদের উদ্যোগে এক লাখ টাকার বেশি খরচ করে রাস্তায় বালি ফেলেছে। সম্প্রতি উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যও রাস্তা উঁচু করার আশ্বাস দিয়েছেন। চার বছর ধরে জলাবদ্ধতার অভিশাপে জর্জরিত বিল ডাকাতিয়ার মানুষের প্রশ্ন-কোটি টাকার প্রকল্পের পরও যদি পানি না নামে, তাহলে এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়?
