বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ গাজীপুরে গার্মেন্টসকর্মী ডলি হত্যার রহস্য কী? মোটিভ উন্মোচনের দাবি পিবিআইয়ের

লাগেজে একাংশ, বস্তায় মাথাসহ বাকি মরদেহ

গাজীপুরে গার্মেন্টসকর্মী ডলি হত্যার রহস্য কী? মোটিভ উন্মোচনের দাবি পিবিআইয়ের

ওবাইদুল ইসলাম, জয়দেবপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি : একটি লাগেজ ভাসছিল সরু খালের পানিতে। কৌতূহলী হয়ে কাছে যেতেই ভেতরে দেখা যায় মানুষের পা। খবর দেওয়া হয় পুলিশে। লাগেজ উদ্ধারের পর বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সত্য, ভেতরে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ। কিছুক্ষণ পর পাশের পানিতে ভাসতে থাকা আরেকটি জুটের বস্তা উদ্ধার করা হয়। সেটি খুলতেই পাওয়া যায় মাথাসহ মরদেহের বাকি অংশ।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার একদিন পর পরিচয় মিলেছে ওই নারীর। তিনি ডলি আক্তার (৩০), ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার কাঠবওলা পাহাড়পাবইজান এলাকার মৃত বাদশা মিয়ার মেয়ে। গাজীপুরের বাঘেরবাজার এলাকার গোল্ডেন রিপিট গার্মেন্টসের সুইং অপারেটর ছিলেন তিনি। মেম্বারবাড়ী এলাকায় একটি বাসায় ভাড়া থেকে চাকরি করতেন। রেখে গেছেন সাত বছরের একটি কন্যাসন্তান।

প্রশ্ন উঠেছে, ডলির কী হয়েছিল? কেনই বা তাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করে মরদেহ খণ্ডিত করা হলো? কারা ছিল এর নেপথ্যে? আর কেনই বা মরদেহের একাংশ লাগেজে এবং অন্য অংশ বস্তায় ভরে পানিতে ফেলে দেওয়া হলো?

শেষ দেখা, শেষ ফোন

স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ সেপ্টেম্বর ছুটি নিয়ে ময়মনসিংহে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন ডলি। পরদিন তার স্বজন ও সাবেক স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়। এরপর থেকেই যেন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান তিনি।

সাবেক স্বামী রাশেদের দাবি, ৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) সকালে ডলি ফোন করে মেয়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে বলেন। একই সঙ্গে তার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে বলেও জানান। পরে রাতে ডলির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও আর তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

নিহতের ভাই সোহেলের ভাষ্য, ৮ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ডলির সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। তখন কিস্তির টাকা পরিশোধের বিষয়ে কথা বলেছিলেন ডলি। এরপর আর বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তারা।

বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তালা দিয়ে

ডলি যে বাসায় ভাড়া থাকতেন, সেই বাসার মালিকের স্ত্রী জানান, ৭ সেপ্টেম্বর ডলি ছুটি নিয়ে ময়মনসিংহে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। পরদিন তিনি বাসায় ফেরেননি। ৯ সেপ্টেম্বর ঘরের ভেতর শব্দ শুনে প্রতিবেশী তাকে ডাকলে ডলি ভেতর থেকে সাড়া দেন বলে জানান তিনি। পরে ওই রাতেই ডলি ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে যান। এরপর আর তাকে দেখা যায়নি।

তারপরই কোথায় গেলেন ডলি? কার সঙ্গে গেলেন? কী ঘটেছিল তার সঙ্গে? এসব প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে।

পারিবারিক বিরোধও কি তদন্তের অংশ?

ডলির পারিবারিক জীবনেও ছিল টানাপোড়েন। ২০১৪ সালে রাশেদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের সাত বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়। কয়েক মাস আগে তাদের বিচ্ছেদও হয়।

তবে এই পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে ডলি হত্যার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত বিভিন্ন সম্পর্কের বিষয় নিয়েও নানা কথা ছড়ালেও সেগুলোর সত্যতা এখনো নিশ্চিত নয়।

তদন্তে নতুন মোড়

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে গাজীপুর জেলা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ইতোমধ্যে ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

পিবিআই জানিয়েছে, তারা হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বা উদ্দেশ্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে।
১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় প্রেস ব্রিফিং করে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

এখন অপেক্ষা শুধু সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরের, ডলির শেষ মুহূর্তগুলো কেমন ছিল? কার সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ হয়েছিল? কেন তাকে হত্যা করা হলো? মরদেহ গোপন করতে এতটা পরিকল্পিত ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয়েছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে পিবিআইয়ের তদন্তে। তবে সাত বছরের মেয়েকে রেখে যাওয়া ডলি আক্তারের এমন পরিণতি ঘিরে মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, একজন কর্মজীবী নারীকে এভাবে হত্যা করার পেছনে আসলে কী ছিল?

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা