শনিবার | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ বাণিজ্য কক্সবাজারে হোটেল-রেস্তোরার বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার

প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে ২০ মণের বেশি

কক্সবাজারে হোটেল-রেস্তোরার বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার

কক্সবাজার থেকে রিয়াজ উদ্দিন : পর্যটননগরী কক্সবাজারে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরার বিপুল পরিমাণ বর্জ্য দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার সেই বর্জ্যকেই সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরার পচনশীল বর্জ্য এবং পয়ঃবর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। এতে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নতুন পথ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি কৃষিতে ব্যবহারের উপযোগী সার উৎপাদনের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কক্সবাজার পৌরসভার সমন্বয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পর্যটন এলাকার হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরার পচনশীল বর্জ্য সংগ্রহ করে তা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় জৈব সারে রূপান্তর করা হচ্ছে।

কক্সবাজারে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক আসেন। পর্যটন মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। পর্যটকদের কেন্দ্র করে শহর ও সৈকত এলাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের অপচনশীল বর্জ্যের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পচনশীল খাদ্যবর্জ্যও রয়েছে।

এতদিন কার্যকর ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব বর্জ্যের একটি অংশ খাল, নদী ও সাগরে গিয়ে পড়ত। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি পর্যটন এলাকার সৌন্দর্যও নষ্ট হতো। সেই বাস্তবতায় বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যেভাবে তৈরি হচ্ছে জৈব সার

প্রকল্প এলাকায় বিশেষ ধরনের গাড়িতে করে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরার বর্জ্য নিয়ে আসা হয়। এরপর শ্রমিকরা বর্জ্য বাছাই করে পচনশীল ও অপচনশীল উপাদান আলাদা করেন। প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল উপাদান সরিয়ে পচনশীল বর্জ্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সংগ্রহ করা বর্জ্য প্রায় ৪৫ দিন ধরে বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরার পচনশীল বর্জ্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে পয়ঃবর্জ্য মিশিয়ে তৈরি করা হয় জৈব সার। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বর্জ্য ধীরে ধীরে জৈব সারে পরিণত হয়।

বর্তমানে প্রকল্পটিতে প্রতিদিন ২০ মণের বেশি জৈব সার উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদিত সার প্রতি কেজি ১০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। পুরো কার্যক্রমে কাজ করছেন ১৮ জন শ্রমিক। বর্তমানে প্রায় ২০টি হোটেল থেকে পচনশীল বর্জ্য সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।

সীমাবদ্ধতা রয়েছে সংগ্রহ ব্যবস্থায়

উদ্যোগটি সম্ভাবনাময় হলেও বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহনে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। পুরো কার্যক্রমে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি গাড়ি। ফলে আরও বেশি হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাকে কার্যক্রমের আওতায় আনার সুযোগ থাকলেও পর্যাপ্ত যানবাহন, সরঞ্জাম ও জনবলের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও সুপারভাইজার মোহাম্মদ ইয়াসিন জানান, বর্তমানে যে পরিমাণ বর্জ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার ভিত্তিতেই সার উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্জ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত যানবাহন যুক্ত করা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

তবে কাঁচামাল সরবরাহের সংকট এবং বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিক বিরূপ পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধসহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

সেফটি ট্যাংকের বর্জ্য নিয়েও পরীক্ষা

শুধু হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরার খাবারের উচ্ছিষ্ট নয়, বাসাবাড়ি ও পর্যটন এলাকার সেফটি ট্যাংকের বর্জ্য নিয়েও সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে কয়েক দফায় সেফটি ট্যাংকের বর্জ্য থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জৈব সার তৈরির কাজ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর শহরে বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদে পরিণত করার এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা গেলে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বর্জ্য সংগ্রহের সক্ষমতা, পর্যাপ্ত যানবাহন ও জনবল বাড়ানো গেলে কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরার বিপুল বর্জ্যকে আরও বৃহৎ পরিসরে জৈব সারে রূপান্তর করা সম্ভব—এমন সম্ভাবনাই দেখাচ্ছে চলমান এই উদ্যোগ।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা