হাবিবুর রহমান: দীর্ঘ এগারো বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতার কাঠামো কার্যকর করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন-১ অনুবিভাগ থেকে জারি করা আদেশটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ১৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার এ আদেশ জারি করেছে। নতুন বেতনকাঠামো গত ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। তবে নতুন মূল বেতনের পুরোটা একবারে পাচ্ছেন না সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গ্রেডভেদে ধাপে ধাপে বর্ধিত অংশ যোগ হবে। এর ফলে জুলাই থেকে গেজেট জারির আগপর্যন্ত সময়ের প্রাপ্য অর্থও বকেয়া হিসেবে পাবেন তারা। কিন্তু বেতন বাড়ার এই সুখবরের সঙ্গে অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে বড় অঙ্কের ব্যয়ের প্রশ্ন। নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য রাখা হয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটের ঘাটতিই ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে পূর্ণ পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ বর্তমান বাজেট ঘাটতির প্রায় ৪৩ শতাংশের সমান। বর্তমান সময়ে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি খাতে চাপ, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি দায় রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-২৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ানোর এই বিশাল ব্যয় সরকার কোথা থেকে মেটাবে? ঋণ করে বেতন দিলে ভবিষ্যতে এর বোঝা কে বইবে, আর এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ১৮ কোটির বেশি মানুষের অর্থনীতিতে কতটা চাপ তৈরি করবে? যদিও সরকার একবারে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন করছে না। মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ফলে সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ পড়বে না। কিন্তু সমস্যা হলো-বেতন ও ভাতার এই বাড়তি ব্যয় একবার শুরু হলে তা আর এককালীন থাকবে না। প্রতি বছরই সরকারের স্থায়ী ব্যয় বাড়বে। এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার ব্যয়ও বাড়বে। এখানেই রাজস্ব আদায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাজস্ব আয় না বাড়লে সরকারকে উন্নয়ন ও অন্যান্য ব্যয় কমাতে হবে, নয়তো ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর সক্ষমতা না বাড়িয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ বাড়বে। ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু পে-স্কেলের জন্য আলাদা করে বড় ঋণ নিয়ে বেতন দেওয়ার কোনো স্পষ্ট নজির নেই। বরং সাধারণ বাজেটের আয়-ব্যয়ের কাঠামোর মধ্যেই অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এবারও সরকারের অবস্থান একই-মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বছরগুলোর বাজেটে অর্থের সংস্থান রাখা হবে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম পদের কর্মচারীদের জন্য তা কিছুটা আর্থিক স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে। বেতন কাঠামো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে পরিবার পরিচালনা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ মেটানো তুলনামূলক সহজ হতে পারে। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন বাড়লে সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা কিছুটা শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আয় পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।এর ফলে পারিবারিক জীবনে স্বস্তি ফেরার পাশাপাশি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানও কিছুটা উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যৌক্তিক বেতন ও আধুনিক ভাতা কাঠামো সরকারি কর্মচারীদের কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়াতে পারে। আর্থিক অনিশ্চয়তা কমলে কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ, দায়িত্ববোধ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।এর প্রভাব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক কার্যক্রমেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে সরকারি সেবার মান উন্নত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে শুধু বেতন বাড়ালেই ঘুষ, অনিয়ম বা দুর্নীতি পুরোপুরি কমে যাবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য বেতন কাঠামোর পাশাপাশি কার্যকর জবাবদিহি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ কার্যকর হলে সাধারণ মানুষ আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি সেবা পেতে পারেন।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পর বাজারে যেন কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো না হয়, সেদিকেও সরকারের নজর দিতে হবে। কর্মচারীদের বেতন বাড়ার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন, তাহলে বেতন বৃদ্ধির সুফল অনেকটাই কমে যেতে পারে। তাই পে স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাজার তদারকি, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সার্বিকভাবে, নতুন পে স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে হলে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক জবাবদিহিও সমানভাবে জরুরি।
এদিকে গতকাল শনিবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতার কাঠামো কার্যকর করে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। গেজেট অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ পাবেন। অন্যদিকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাবেন বর্ধিত অংশের ৫০ শতাংশ। ওই অর্থ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আহরিত বা প্রাপ্য মূল বেতনের সঙ্গে যোগ হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের জন্য বর্ধিত অংশের মোট ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য মোট ৭৫ শতাংশ কার্যকর হবে। এরপর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিসহ নতুন মূল বেতনের শতভাগ দেওয়া হবে। প্রথম ছয় মাসে তুলনামূলক কম বেতনের কর্মচারীদের জন্য বর্ধিত অংশের অর্ধেক কার্যকর হচ্ছে। আর উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তা ৪০ শতাংশ। পরের বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় ধাপ এবং জুলাইয়ে গিয়ে নতুন মূল বেতন পুরোপুরি কার্যকর হবে। নতুন বেতনকাঠামোয় ১ম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ। তবে মূল বেতন পুরোপুরি কার্যকর হলেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব, বাংলা নববর্ষসহ অন্যান্য ভাতার নতুন হার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে না। গেজেট অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত এসব ভাতা বিদ্যমান হারে দেওয়া হবে। ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী নির্ধারিত হারে ভাতা কার্যকর হবে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত বাস্তবায়ন কাঠামোতেও একই সময়সূচি রাখা হয়েছিল। নতুন কাঠামোর সঙ্গে পেনশনভোগীদের সুবিধাও ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হচ্ছে। গেজেটে নিট পেনশনের স্তর অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে বর্ধিত অংশের ৪০ বা ৫০ শতাংশ এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৭০ বা ৭৫ শতাংশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে তাদের ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামো অনুযায়ী পূর্ণ নিট পেনশন কার্যকর হবে। জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের দেওয়া আগের ‘বিশেষ সুবিধা’ বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে। ১ জুলাই থেকে গেজেট জারির সময় পর্যন্ত কেউ ওই বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকলে তা নতুন বেতনকাঠামোর অধীনে প্রাপ্য বকেয়ার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করা হয়। অনুমোদিত কাঠামোতে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের জন্য ৪০, ৩০ ও ৩০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ৫০, ২৫ ও ২৫ শতাংশ হারে তিন ধাপে বর্ধিত মূল বেতন কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অষ্টম জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রায় এক যুগ পর নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও আর্থিক প্রভাব পর্যালোচনা শেষে সরকার ধাপে ধাপে নতুন কাঠামো কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয়। সংক্ষেপে বাস্তবায়নের সময়সূচি: ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ম ৯ম গ্রেডে বর্ধিত অংশের ৪০ শতাংশ ও ১০ম ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ; ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে যথাক্রমে মোট ৭০ ও ৭৫ শতাংশ; ১ জুলাই ২০২৭ থেকে নতুন মূল বেতনের শতভাগ এবং ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে নতুন হারে অন্যান্য ভাতা কার্যকর হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এর ফলে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁট করতে হতে পারে। পাশাপাশি চাপের মুখে পড়বে বেসরকারি খাতের মানুষ।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সংকট কমলে দুর্নীতির প্রবণতাও কমতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও দুর্নীতি কমানোর জন্য এটি যথেষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা আশা করা কঠিন। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে-এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। তিনি নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদবিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। শুধু নিজের নয়, পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাবও প্রতিবছর হালনাগাদ করতে হবে।
১১
