# হোমিওপ্যাথিক ওষুধে অ্যালকোহলের ব্যবহার ও লাইসেন্স জটিলতা
# সূক্ষ্ম মাত্রার ওষুধকে মাদক হিসেবে গণ্য করায় আতঙ্কিত চিকিৎসকরা
# মাদক দ্রব্য আইনে হোমিওপ্যাথি ওষুধকে ওষুধ বলা যাবে না, আমদানী করতে হবে মাদক হিসেবে
# হয়রানি ও আইনি জটিলতা নিরসনে মাদক আইন সংশোধনের দাবি
স্টাফ রিপোর্টার: মাদক আইনের কঠোর ও অস্পষ্ট বিধানের গ্যাঁড়াকলে পড়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন চরম সংকটের মুখে। হোমিওপ্যাথিক ওষুধে চিকিৎসাগত প্রয়োজনে ব্যবহৃত অ্যালকোহলকে মাদক হিসেবে গণ্য করায় এবং লাইসেন্স জটিলতার সৃষ্টি হওয়ায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে প্রশাসনিক হয়রানি। এতে একদিকে সূক্ষ্ম মাত্রার এসব জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন চিকিৎসক ও খাতসংশ্লিষ্টরা। মাদক দ্রব্য আইনে হোমিওপ্যাথি ওষুধকে ওষুধ বলা যাবে না। আমদানী করতে হবে মাদক হিসেবে। অন্যদিকে বাজারে দেখা দিয়েছে প্রয়োজনীয় হোমিও ওষুধের তীব্র সংকট। ফলস্বরূপ, সাধারণ রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা সেবা না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এই অচলাবস্থা নিরসনে অবিলম্বে মাদক আইন সংশোধনের জোরালো দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। এইসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কঠোরভাবে নিদের্শনা দিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ডিজিকে। এছাড়াও বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম লিখিত অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ সচিবালয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতিও জনপ্রিয়। স্বল্প ব্যয় ও সহজলভ্যতার কারণে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিপুল জনগোষ্ঠির আস্থা রয়েছে। অন্যদিকে চিকিৎসা সেবা প্রদানসহ আনুষঙ্গিক যোগানে সম্পৃক্ত রয়েছেন অনেকে। তবে হালে এ চিকিৎসা সেবার ব্যয়বৃদ্ধিসহ নানা জটিলতা তৈরির আশংকা দেখা দিয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রণীত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ওই আইনবলে বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সংরক্ষণ, ব্যবহার ও বিপণনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে করে একদিকে ঔষধ আমদানি, উৎপাদন ও বিপণনের সাথে জড়িতদের নতুন বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হবে, তেমনি চিকিৎসকদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ আমদানির ক্ষেত্রে ড্রাগ রুলস, ১৯৪৬, ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২ এবং পরবর্তীতে ওই অধ্যাদেশকে রহিত করে ঔষধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩-এর ধারাসমূহ অনুসরণ করা হয়। অত্র আইনের বিধি বিধানের আলোকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স গ্রহণ করে নিবন্ধনের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ আমদানি করে থাকেন। প্রতিবার ঔষধ আমদানির পূর্বে ঔষধ প্রশাসন অনুমোদিত ব্লক লিস্টে উল্লেখিত ঔষধ ও পরিমাণ অনুযায়ী আমদানি নীতিমালা অনুসারে নির্ধারিত এইচএস কোড-এর মাধ্যমে আমদানি করা হয়। পাশাপাশি একই আইনের আওতায় নিবন্ধনের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকণ চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে। তবে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে একটি বিশেষ গোষ্ঠিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অজুহাত হিসেবে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ও মাদার টিংচার প্রস্তুত এবং সংরক্ষণের জন্য প্রধান বাহক বা ভেহিকেল হিসেবে রেকটিফাইড স্পিরিট বা ইথাইল অ্যালকোহলের অপব্যবহারকে সামনে আনা হয়। তাছাড়া মাদক আইনের ধারা অনুযায়ী কোনো তরল বা দ্রব্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি অ্যালকোহল থাকলে তা মাদকদ্রব্যের আওতায় পড়ে। অথচ আমেরিকার বোরিক এন্ড টাফেল (বিটি) এবং জার্মানীর উইলসার সোয়েবসহ শীর্ষস্থানীয় হোমিও ঔষধ কোম্পানি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ফার্মাকোপিয়া অনুসারে উৎপাদিত ঔষধে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত অ্যালকোহল বিদ্যমান। কাজেই মাদক আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে কোনো ঔষধের উৎপাদন, বিপণন বা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। সব কিছু মিলিয়ে সমস্যার সমাধান হিসেবে একতরফাভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০২২ করা হয়। এর পর থেকে তল্লাশি এবং হয়রানির শিকার হচ্ছেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে কড়াকড়ি ও জটিল লাইসেন্স প্রক্রিয়ার কারণে মাদার টিংচার ও প্রয়োজনীয় তরল ওষুধ আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে বাজারে জীবনরক্ষাকারী হোমিওপ্যাথিক ওষুধের সংকট দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়ছে সাধারণ ও দরিদ্র রোগীদের ওপর।
তবে শুরু থেকেই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্তরা এ আইনের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের ভাষ্য, হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সূক্ষ্ম মাত্রায় ব্যবহার হয়। অন্যদিকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষার্ধে আমদানিকৃত একটি ঔষধের চালানের বিষয়ে যশোর কাস্টমস কমিশনারের প্রেরিত চিঠির প্রেক্ষিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী মো. রশীদ উন-নবী এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলমের মতামত সংক্রান্ত ৪টি চিঠি উল্লেখ করা যেতে পারে। এর মধ্যে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বিভিন্ন স্বীকৃত হোমিওপ্যাথিক ফার্মাকোপিয়া অনুসারে ও ঔষধ ভেদে সাধারণতঃ ৩০ শতাংশ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত অ্যালকোহল বিদ্যমান থাকে। প্রেরিত হোমিওপ্যাথিক মাদার টিংচার ও পটেন্সি মেডিসিন (ডাইলুশন) এর নমুনাসমূহ হোমিওপ্যাথিক ঔষধ যাতে অ্যালকোহল এর পরিমাণ (৪৯ শতাংশ ও ৯০ শতাংশ) যা ফার্মাকোপিয়া অনুসারে সঙ্গতিপূর্ণ।’ অপরদিকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রারের একই বিষয় আরো বিশদভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা বিষয়টি সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে আসছেন। সুরাহার আশায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বরাবর আবেদন করে সাড়া পাননি। উপায়ন্তর না পেয়ে মাদক দ্রব্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট (নং-৩১৫২/২০২৬) দায়ের করেছেন। ‘হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন এন্ড মেডিসিনাল প্লান্ট ইমপোর্টারর্স এন্ড এক্সপোর্টারর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ’ দায়েরকৃত রিটের প্রেক্ষিতে আদালত রুল জারি করেছেন। সেটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে। এরপরও মাদক দ্রব্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে লাইসেন্স গ্রহণের জন্য সারা দেশে হোমিও চিকিৎসকদের চাপ দেয়া হচ্ছে। এতে করে অনেকেই চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে নিজ ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সবাই ফের আশার আলো দেখছেন। আইনটি রহিত বা পরিবর্তন করতে নতুন সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করে আবেদন করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, দেশে বর্তমানে ৬৫ টি হোমিও ডিপ্লোমা এবং দুইটি ডিগ্রী কলেজ রযেছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা জীবন সম্পন্ন করে চিকিৎসা সেবায় সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এজন্য তাদের কিছু সরকারি নিয়ম-কানুন মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। হয়রানির মাত্রা কমাতে এবং জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তির সুবিধার্থে প্রচলিত আইনে উল্লেখিত মাদকের সংজ্ঞায় ‘হোমিওপ্যাথিক ঔষধ ব্যতীত’ শব্দটি সংযোজন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
