বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ১৫, ২০২৬
প্রচ্ছদ বাণিজ্য ভোলার গ্যাস বদলে দিতে পারে দেশের জ্বালানির ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির চাকা

ভোলার গ্যাস বদলে দিতে পারে দেশের জ্বালানির ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির চাকা

ভোলা থেকে মোঃ এরশাদুল ইসলাম আজাদ : বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামো ও বিনিয়োগের অভাবে পুরোপুরি কাজে লাগছে না গ্যাসসম্পদ । দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকায় ভোলার গ্যাসসম্পদ নতুন করে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, বিনিয়োগ, গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

ভোলার শাহবাজপুর, ভোলা-নর্থ ও ইলিশা—এই তিনটি গ্যাসক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে জেলার জ্বালানি খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্যাসক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে প্রায় ২ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস । এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪৩৩ ঘনফুট টিসিএফ উত্তোলন যোগ্য বলে উল্লেখিত রয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ৭ দশমিক ৪৩ টিসিএফ। সেই হিসেবে দেশের মোট অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় ১৯ শতাংশ বা এক পঞ্চমাংশই রয়েছে ভোলায়।

ভোলায় ৯টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আরো প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত থাকার তথ্য রয়েছে।

এই গ্যাস পরিকল্পিতভাবে অনুসন্ধান, উত্তোলন ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি ভোলার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নতুন গতি আসতে পারে।

চাহিদা বাড়ছে, বাড়ছে গ্যাসের গুরুত্ব

দেশে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও আবাসিক খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও মজুতের ওপর চাপ বাড়ায় আমদানিনির্ভর জ্বালানির গুরুত্বও বেড়েছে। এ অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরে নতুন গ্যাসের মজুত অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার জরুরি হয়ে উঠেছে।

ভোলার গ্যাস এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। জেলার গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি উৎপাদিত গ্যাস ব্যবহারের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় অপার সম্ভাবনা

ভোলায় গ্যাসের মজুত ও উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গ্যাস পরিবহনের পাইপলাইন, বিতরণব্যবস্থা, শিল্পকারখানার চাহিদা এবং নতুন বিনিয়োগের বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে উঠলে ভোলায় নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

নতুন অনুসন্ধানে বাড়তে পারে মজুত

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর পাশাপাশি নতুন কূপ খনন, ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। এতে নতুন গ্যাসের মজুত শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে সম্ভাব্য মজুত, প্রমাণিত মজুত এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ এক নয়। তাই সঠিক মূল্যায়ন ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

সমন্বিত পরিকল্পনাই হতে পারে সমাধান

ভোলার গ্যাসসম্পদকে জাতীয় উন্নয়নে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পাশাপাশি গ্যাস পরিবহন, বিতরণ এবং শিল্পায়নের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকারি সংস্থা, সংশ্লিষ্ট জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বিনিয়োগনীতি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ভোলার গ্যাস শুধু জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নেই নয়, দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। ফলে ভোলার গ্যাসসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এখন জাতীয় স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা