# আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে পর্যটন কূটনীতি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নগর ব্যবস্থাপনা থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়
ব্যাংকক ফিরে জাহাঙ্গীর খান বাবু : আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেবল অর্থনীতি, ঋণ, উন্নয়ন সহযোগিতা কিংবা নীতিনির্ধারণী আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এ ধরনের আয়োজন আয়োজক দেশের জন্য নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পর্যটন সম্ভাবনা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, নগর ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরারও এক অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করে। ২০২৬ সালের ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (QSNCC) অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনও ছিল তেমনই একটি উপলক্ষ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ব্যাংকক পরিণত হয়েছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে। সম্মেলন উপলক্ষে নিবন্ধিত ও আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের সামনে থাইল্যান্ডের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা, পর্যটন অবকাঠামো, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এই আন্তর্জাতিক সমাবেশকে ঘিরে থাইল্যান্ডের পর্যটন ও বিনিয়োগ ব্র্যান্ডিংয়ের সম্ভাবনাকে কতটা কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো হয়েছে?
আয়োজক দেশ হিসেবে থাইল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পর্যটন কর্তৃপক্ষ এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলো চাইলে সম্মেলনে অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি বিশেষ মতবিনিময় সভা, মধ্যাহ্নভোজ কিংবা নৈশভোজের আয়োজন করতে পারত। সেখানে থাইল্যান্ডের পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা যেত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মতামত ও পরামর্শ শোনার মাধ্যমে দেশটির বৈশ্বিক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব ছিল।
এ ধরনের উদ্যোগকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার, আলোকচিত্র কিংবা ভ্রমণবিষয়ক ফিচার কোনো দেশের পর্যটন আকর্ষণকে নতুন দর্শকের সামনে পরিচিত করে তুলতে পারে। সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রসৈকত, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ঐতিহ্যবাহী খাবার, জীবনধারা ও আধুনিক নগরজীবনের ইতিবাচক দিকগুলো বিশ্বজুড়ে তুলে ধরার একটি কার্যকর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এ সুযোগকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত মিডিয়া আউটরিচ বা গণমাধ্যম-সম্পৃক্ত কর্মসূচি নেওয়া গেলে তার সুফল সম্মেলন শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া সম্ভব ছিল।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলন মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র। তবে এর সঙ্গে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে টেকসই পর্যটন, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মতো বিষয়েও নতুন অংশীদারত্বের পথ তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সংস্থা, থাই কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
সম্মেলন শেষ হয়েছে। ফলে এ সময়ের মধ্যে এমন কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সমীচীন নয়। তবে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে মনে হয়েছে, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সঙ্গে থাইল্যান্ডের পর্যটন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আরও সুসংগঠিত মতবিনিময়ের সুযোগ ছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রে বিষয়টি থাই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।
থাইল্যান্ডের শক্তি অবশ্য কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির পর্যটন অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, নগরজীবন ও সেবামুখী ব্যবস্থাপনা এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আলোচনায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে। অল্প সময়ের ব্যাংকক সফর এবং পাতায়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় দেশটির কিছু ইতিবাচক দিক কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে এসব অভিজ্ঞতা আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
ব্যাংককের সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা, নগর পরিবহন এবং সম্মেলনকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা আমার কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে। সম্মেলনকেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য শাটল পরিবহনের সুবিধা আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীদের চলাচল সহজ করেছে। মিডিয়া সেন্টারের কার্যক্রম ও সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত সুবিধাও সংবাদ সংগ্রহের কাজে সহায়ক ছিল। এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন সফল করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; পরিবহন, নিরাপত্তা, তথ্যপ্রবাহ ও সেবার সমন্বিত ব্যবস্থাপনাও জরুরি।
তবে ব্যাংকক শহরের যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে, তা হলো নগরের খালগুলো। শহরের বিভিন্ন খালে নৌযান চলাচল করতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও খালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কর্মীদের কাজ করতেও চোখে পড়েছে। এসব দৃশ্য থেকে খালকে কেবল পানি নিষ্কাশনের পথ হিসেবে নয়, বরং নগর পরিবহন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং শহরের জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে বিবেচনার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। অবশ্য ব্যাংককের সব খাল সমানভাবে পরিচ্ছন্ন কিংবা সমস্যামুক্ত—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কিন্তু নগরজীবনে খালের ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় দিক রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাস্তবতা এর বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। নগরের বহু খাল দখল, দূষণ, বর্জ্য জমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে সংকুচিত হয়েছে কিংবা স্বাভাবিক পানি প্রবাহ হারিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নগরবাসীর জীবনযাত্রায়। অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে খালগুলোকে আবারও নগর ব্যবস্থাপনার কার্যকর অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর অংশীদারত্বের সুযোগ রয়েছে। ঢাকার খাল পুনরুদ্ধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি প্রবাহ সচল রাখা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, সংশ্লিষ্ট পরিবেশ কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের অন্যান্য সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহির বিষয়গুলোও পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।
এখানে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, খাল পরিষ্কারের আধুনিক যন্ত্রপাতি, বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ, পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায় দেশীয় উদ্যোক্তারা ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে এ ধরনের উদ্যোগে শুধু যন্ত্রপাতি সরবরাহ করলেই চলবে না; দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা, স্বচ্ছ চুক্তি, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। খাল দখলমুক্ত রাখা ও দূষণ বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া কোনো প্রকল্পই স্থায়ী সুফল দিতে পারবে না।
বাংলাদেশের জন্য ব্যাংককের অভিজ্ঞতার শিক্ষা হলো—নগর উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিবহন, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন ও জনজীবনকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে তা শুধু জলাবদ্ধতা কমানো বা পরিবেশের উন্নয়নেই ভূমিকা রাখবে না; নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যতে পরিকল্পিত জলপথভিত্তিক পরিবহন বা বিনোদনের সুযোগ তৈরিতেও সহায়ক হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের আগে যথাযথ সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলন কাভার করতে এসে থাইল্যান্ডের ভাষা, সংস্কৃতি, নগরজীবন ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার নানা দিক দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন সাংবাদিক হিসেবে এ অভিজ্ঞতা আমার কাছে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের স্মৃতি নয়; বরং উন্নয়ন, সুশাসন ও নগর পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।
আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষ হয়ে যায়, অতিথিরা নিজ নিজ দেশে ফিরে যান। কিন্তু এমন আয়োজনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় এর মধ্য দিয়ে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক, নতুন ধারণা, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে। থাইল্যান্ডের জন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে আরও পরিকল্পিতভাবে সম্পৃক্ত করার সুযোগ যেমন ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও অন্য দেশের নগর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে বাস্তবসম্মত শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
ব্যাংককের খালগুলো দেখে ঢাকার খালগুলোর কথা মনে পড়েছে। এ দুই নগরের বাস্তবতা এক নয়, কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন একই—আমরা কি আমাদের প্রাকৃতিক ও নগরসম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু অভিজ্ঞতা বিনিময় নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতি, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি ঢাকার খাল পুনরুদ্ধার ও নগর ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, তবে ব্যাংকক সফরের এই অভিজ্ঞতা নিছক ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা হয়ে উঠতে পারে দেশের উন্নয়ন ভাবনায় কাজে লাগানোর মতো একটি শিক্ষা।
