এইচ এন আলম, কক্সবাজার : কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখছে জাপান। বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশকে উত্তর-পূর্ব ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। বন্দরটি ঘিরে সড়ক, যোগাযোগ ও শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য এবং বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি করতে চায় জাপান। এ লক্ষ্যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর, শিল্প ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
আঞ্চলিক যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা
মাতারবাড়ী বন্দরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নৌবাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে ফেনী নদীর ওপর বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল ও ভারতের ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমানে সেতুটির কার্যকর ব্যবহার নিয়ে সীমাবদ্ধতার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী জাপানি কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে মাতারবাড়ী বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে।
তারেক রহমানের জাপান সফর ঘিরে আলোচনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। গত আগস্টে জাপান সফরের প্রস্তুতি ও এ-সংক্রান্ত আলোচনায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মাতারবাড়ী শুধু একটি সমুদ্রবন্দর হিসেবেই নয়, বরং শিল্পায়ন, পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতি ও বাণিজ্যে সম্ভাব্য প্রভাব
বর্তমানে বাংলাদেশ বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরের ওপর নির্ভর করে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে আন্তর্জাতিক নৌপথে সরাসরি পণ্য পরিবহন এবং আমদানি-রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল, সড়ক যোগাযোগ, লজিস্টিকস ও গুদাম অবকাঠামো গড়ে উঠলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। এতে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন গতি সঞ্চারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে বন্দর নির্মাণের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক, পণ্য পরিবহনব্যবস্থা, শিল্প অবকাঠামো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর বাণিজ্যিক সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে জাপানের সহযোগিতায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপরই নির্ভর করবে এ সম্ভাবনার সাফল্য।
