সোমবার | অক্টোবর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ বাণিজ্য আলো ঝলমলে ব্যাংকক, নিরাপত্তা ও পর্যটন অর্থনীতির অন্য এক পাঠ

আলো ঝলমলে ব্যাংকক, নিরাপত্তা ও পর্যটন অর্থনীতির অন্য এক পাঠ

# রাত যত গভীর, তত সরব নগরী; আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আবহে বিশ্বজনের মিলনমেলা

ব্যাংকক থেকে জাহাঙ্গীর খান বাবু: রাত যত গভীর হয়, থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক যেন ততই জেগে ওঠে। ঝলমলে আলো, নাইটক্লাবের সংগীত, রেস্তোরাঁর ব্যস্ততা, ম্যাসাজ সেন্টারের সামনে কর্মীদের উপস্থিতি আর নানা দেশের পর্যটকদের আনাগোনায় সরব হয়ে ওঠে নগরীর বিভিন্ন এলাকা। কোথাও মেট্রোরেলের ছুটে চলা, কোথাও ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে গাড়ির বহর, আবার কোথাও খালের বুকে চলাচল করছে নৌযান। আধুনিক নগরব্যবস্থা, পর্যটননির্ভর বাণিজ্য ও বৈচিত্র্যময় রাতের জীবন—সব মিলিয়ে ব্যাংকক এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার নাম।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা উপলক্ষে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও সাংবাদিকদের পদচারণায় মুখর ছিল ব্যাংকক। কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন কাভার করতে এসে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পাশাপাশি শহরটির জীবনযাত্রা ও পর্যটন অর্থনীতির নানা দিক কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

ব্যাংককের নানা স্কয়ার, টার্মিনাল ২১ ও এম্বাসেডর হোটেলসংলগ্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর রাতের জীবনের ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। সড়কের দুই পাশে বার, নাইটক্লাব ও ম্যাসাজ সেন্টার ঘিরে মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। কোনো কোনো ক্লাবে বাইরে থেকেই নাচ ও সংগীতের দৃশ্য দেখা যায়। ম্যাসাজ সেন্টারের সামনে সাজসজ্জায় থাকা কর্মীরা পথচারী ও পর্যটকদের সেবা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। কিছু এলাকায় অর্থের বিনিময়ে যৌনসেবার প্রস্তাবও চোখে পড়ে। হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয়ে পরিচিত অনেক মানুষ, যাঁদের থাইল্যান্ডে প্রচলিতভাবে ‘লেডিবয়’ বলা হয়, তাঁরাও বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত থাকেন।

নানা স্কয়ার থেকে চারদিকে বিস্তৃত সড়কগুলোতে রাতের বাণিজ্যের ব্যস্ততা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রচারকৌশল রয়েছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকায় বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনাও বাড়তে দেখা যায়। কোথাও বয়স্ক পর্যটকদের পানীয় হাতে বসে গল্প করতে, হাসি-আড্ডায় সময় কাটাতে দেখা যায়। পোশাক, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রত্যেকে নিজের মতো করে সময় কাটাচ্ছেন। অপরিচিত মানুষের পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশ্যে কটূক্তি করার দৃশ্য আমার চোখে পড়েনি।

একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে এসব দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে মনে হয়েছে, পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাতের বিনোদন ও ব্যক্তিগত সেবার ওপর নির্ভরশীল। তবে এর পাশাপাশি ব্যাংককের বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্থাপনা, খাবার, কেনাকাটা ও আধুনিক নগরজীবনও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।

ব্যাংককে চলাফেরার সময় আমার কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার অভিজ্ঞতা। রাতের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর সময় বড় ধরনের কোনো নিরাপত্তা বিঘ্নের মুখে পড়িনি। বিদেশি পর্যটকদেরও গভীর রাত পর্যন্ত চলাফেরা করতে দেখেছি। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পুরো নগরীতে অপরাধ নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা, কার্যকর পরিবহন ও জনশৃঙ্খলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়।

নগরীর যাতায়াতব্যবস্থা আধুনিক ও বৈচিত্র্যময়। উঁচু পথে মেট্রোরেল, সড়কের ওপর ফ্লাইওভার, নিচে যানবাহন চলাচল এবং খালপথে নৌযান—সবকিছু মিলিয়ে শহরের পরিবহনব্যবস্থায় একাধিক মাধ্যমের সমন্বয় দেখা যায়। নানা স্কয়ার এলাকার কাছাকাছি মেট্রোরেল স্টেশন থেকে অল্প দূরত্বে বিভিন্ন বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক এলাকা রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন অংশে সড়ক ও রেলপথের এই সমন্বয় পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে সুবিধা সৃষ্টি করেছে।

রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে ট্রাফিক সিগন্যাল ও পথচারীদের জন্য নির্ধারিত ব্যবস্থাও চোখে পড়েছে। কয়েকবার পথচারী পারাপারের সময় যানবাহন থেমে যেতে দেখেছি। সিগন্যালের নিয়ম মেনে চলা এবং পথচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার এমন অভিজ্ঞতা সড়কশৃঙ্খলার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে সব চালক সব সময় নিয়ম মানেন—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

থাইল্যান্ডের মানুষের আচরণেও একটি বিষয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। দোকানে কেনাকাটা শেষে বিল পরিশোধের পর অনেক বিক্রয়কর্মী হাত জোড় করে বা প্রচলিত ভঙ্গিতে কৃতজ্ঞতা জানান। বিভিন্ন দোকান ও সেবাকেন্দ্রে কর্মীদের বিনয়ী আচরণ চোখে পড়েছে। পরিবহন ও অন্যান্য সেবায় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণও দৃশ্যমান। এসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা বিদেশি একজন অতিথির কাছে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে।

ব্যাংককের খাবারের বৈচিত্র্যও উল্লেখ করার মতো। পাকিস্তানি, ভারতীয়, দক্ষিণ ভারতীয়, বাংলাদেশি ও থাই খাবারের রেস্তোরাঁ রয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। সামুদ্রিক খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁয় মাছ, কাঁকড়া, শামুকসহ নানা ধরনের খাবার বিক্রি হতে দেখা যায়। ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের একসঙ্গে এসব স্থানে সময় কাটাতে দেখা যায়। ভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষের এই সহাবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যটননগরীর বহুজাতিক চরিত্রকে সামনে আনে।

সফরের শেষ দিনে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম বিগ সি বিপণিবিতানে। বিশাল এই বিপণিবিতানের একাধিক তলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, পোশাক, খাদ্যসামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের পণ্যের সমাহার। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও ক্রেতাদের সেখানে কেনাকাটা করতে দেখা যায়। বিক্রয়কর্মীরা পণ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য দেন, আর ক্রেতারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কেনাকাটা করেন। বড় বিপণিবিতানকে ঘিরে এমন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পর্যটন অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে কেন্দ্র করে ব্যাংককের বিভিন্ন হোটেলেও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আবহ লক্ষ করা গেছে। রেডিসন ব্লু, ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও এম্বাসেডরসহ বিভিন্ন হোটেলের সামনে বার্ষিক সভাসংক্রান্ত ব্যানার ও প্রচারসামগ্রী চোখে পড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও অতিথিদের উপস্থিতিতে সম্মেলনকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় ছিল বাড়তি ব্যস্ততা।

ব্যাংককের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের অভিজ্ঞতা দেশটির বৈশ্বিক পরিচিতি ও পর্যটনশিল্পের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। তবে ১৯৯১ সালের কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে থাইল্যান্ডের পর্যটন বিকাশের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার আগে ঐতিহাসিক তথ্য ও অর্থনৈতিক উপাত্ত যাচাই করা প্রয়োজন। পর্যটনশিল্পের বিকাশ সাধারণত অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক প্রচার ও সরকারি নীতিসহ নানা বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।

১৮ অক্টোবর শেষ হয়েছে এবারের আইএমএফ–বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা। পরদিন ১৯ অক্টোবর দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে আমার দেশে ফেরার ফ্লাইট। সকাল সাড়ে ১০টায় আইএমএফের ব্যবস্থাপনায় গাড়িতে সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। ফলে ব্যাংককের এই রাতই সফরের শেষ রাত।

পেছনে থেকে যাবে আলো ঝলমলে নগরী, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ব্যস্ত দিনগুলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় এবং স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত। দৈনিক জনতার পাঠকদের জন্য ব্যাংকক থেকে একের পর এক প্রতিবেদন পাঠানোর দায়িত্বও শেষ হলো। এই সফর আন্তর্জাতিক অর্থনীতির আলোচনা যেমন কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে, তেমনি একটি বৈশ্বিক নগরীর পরিবহন, পর্যটন, বাণিজ্য ও জনজীবন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতাও দিয়েছে।

বিশ্বায়নের যুগে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ুক—এটাই প্রত্যাশা। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি ও সহায়তা যেন পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় এবং দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করে। বিশ্বের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সুফল যেন শুধু বড় অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছে যায়।

ব্যাংকক থেকে বিদায়ের মুহূর্তে একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে এটাই আমার প্রত্যাশা—আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও মানবিক হোক, বৈশ্বিক উন্নয়নের সুফল পৌঁছাক সবার ঘরে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা