স্টাফ রিপোর্টার : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সদর দপ্তরে চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বদলি আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে একই চেয়ার আঁকড়ে রাখার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বনি আমিন খানের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, এই পদকে কেন্দ্র করে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবার গড়িয়েছে খোদ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে সতীর্থ কর্মকর্তার ওপর বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে হামলার চেষ্টা পর্যন্ত।
সরকারি আদেশ অমান্য এবং পেশাজীবী সংগঠনের চত্বরে বহিরাগত অনুপ্রবেশের এই ঘটনায় সাধারণ কৃষিবিদ ও কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
এক নজরে মূল ঘটনা: মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য: ১ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া বদলি আদেশ ৫ মাসেও কার্যকর করেননি অতিরিক্ত উপপরিচালক বনি আমিন খান।
যোগদানে বাধা: নতুন দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ কর্মস্থলে বসতে পারছেন না।
কেআইবি-তে মারামারি: সতীর্থ কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ সুমনের ওপর বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে হামলার চেষ্টার অভিযোগ।
তীব্র ক্ষোভ: বিতর্কিত কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ডে ডিএই-এর প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম।
৫ মাস ধরে ফাইলবন্দি মন্ত্রণালয়ের ‘অবিলম্বে কার্যকর’ আদেশ
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ‘জনস্বার্থে’ অবিলম্বে কার্যকরের শর্তে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তার বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী—উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) পদে কর্মরত বনি আমিন খান-কে অতিরিক্ত উপপরিচালক (ফুল ও ফল) পদে এবং ওই পদে কর্মরত মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ-কে অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) পদে বদলি করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে বনি আমিন খান তার পূর্বের লোভনীয় ‘আমদানি’ পদটি ছাড়ছেন না। ফলে পদায়ন পেয়েও দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারছেন না মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। এতে করে প্রশাসনিক কার্যক্রমে তীব্র জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এই বিষয়ে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “আমার বদলির আদেশ জারি হলেও যেখানে যোগদান করব, সেখানকার কর্মকর্তা এখনো স্বপদে বহাল আছেন। তাই আমি যোগদান করতে পারছি না।”
চরিত্র হননের চেষ্টা ও কেআইবি চত্বরে হাতাহাতি
বদলি আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ার এই প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেই গত ৮ জুন (সোমবার) সন্ধ্যায় খামারবাড়িসংলগ্ন কেআইবি চত্বরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিএই-এর অতিরিক্ত উপপরিচালক (প্রশাসন-২) মাসুম বিল্লাহ সুমনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক আক্রোশ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন বনি আমিন খান। সুমন শেকৃবি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এ্যাব-(এগ্রিকালচারিস্টস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) এর নেতা। তাকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে ছবি ছড়ানোর প্রতিবাদ করতে গেলে গত সোমবার সন্ধ্যায় দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে বনি আমিন চোখে আঘাত পান।
বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে ‘তুলে নেওয়ার চেষ্টা’ প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এই ঘটনার পরপরই বনি আমিন খান মুঠোফোনে একদল বহিরাগত সন্ত্রাসীকে কেআইবি চত্বরে ডেকে আনেন। সন্ত্রাসীরা কেআইবি-তে প্রবেশ করে মাসুম বিল্লাহ সুমনকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। তবে বিষয়টি জানাজানি হলে এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শী কৃষিবিদরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে জড়ো হতে শুরু করলে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সন্ত্রাসীরা কেটে পড়ে।
পেশাজীবীদের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে এভাবে বহিরাগত সন্ত্রাসী ডেকে এনে একজন সতীর্থকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় সাধারণ কৃষিবিদদের মাঝে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সিনিয়র নেতাদের মধ্যস্থতায় সাময়িক সমঝোতা
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ্যাব-এর সদস্য সচিব শাহাদাৎ হোসেন বিপ্লবসহ সিনিয়র কৃষিবিদ নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে উভয় পক্ষকে নিয়ে সমঝোতা বৈঠকে বসেন। হাতাহাতির সময় চোখে আঘাত পাওয়ার কারণে সৌজন্যতাবশত বৈঠকে মাসুম বিল্লাহ সুমন দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এ্যাবের সদস্য সচিব শাহাদাৎ হোসেন বিপ্লব বলেন,
“বনি আমিন খান ও মাসুম বিল্লাহ সুমনের মধ্যে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। সিনিয়র কৃষিবিদ নেতৃবৃন্দ বসে তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দিয়েছেন। আমরা আশা করি ভবিষ্যতে এ নিয়ে আর কোনো বাড়াবাড়ি হবে না।”
ক্ষোভের মুখে বনি আমিনের অতীত ও পদ আঁকড়ে থাকার রহস্য
নেতৃবৃন্দ সাময়িক সমঝোতা করলেও সাধারণ কৃষিবিদদের মাঝে ক্ষোভ কমেনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বনি আমিন খানের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে নানা সুবিধাভোগের অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর লোগো বনি আমিনের ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার হিসেবে শোভা পাচ্ছিল, যা তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ দেয়।
কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে ‘আমদানি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ উইং থেকে সরিয়ে ‘ফুল ও ফল’ শাখায় বদলি করা হলেও, কোন অদৃশ্য শক্তির জোরে তিনি দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করে একই চেয়ার আঁকড়ে আছেন?
উল্লেখ্য, এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত কর্মকর্তা বনি আমিন খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
চেইন অব কমান্ড রক্ষায় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ
একটি সরকারি দপ্তরের বদলি আদেশ মাসের পর মাস বাস্তবায়িত না হওয়া এবং তা নিয়ে সদর দপ্তরে অস্থিরতা ও সহিংসতার চেষ্টা সরকারি কর্মসংস্থান বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিএই সদর দপ্তরের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা, অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একজন আদেশ অমান্যকারী বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বর্তমান সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সাধারণ কৃষিবিদরা।
৫৫
