গাইবান্ধা থেকে মিলন খন্দকার: নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া ফকির থেকে ৪০ কোটি টাকার রামমন্দির নির্মানের টাকার উৎস উদঘাটনে প্রতিষ্ঠাতা হরিদাস চন্দ্র তরনী দাসকে চারদিনের রিমান্ডে নিয়েছে ঢাকার সিআইডি পুলিশ।
এদিকে ৫ দাবি আদায়ে সোচ্ছার রয়েছে আন্দেলনকারি হেফাজতে ইসলাম সহ ইসলামি দলগুলো।
নেতারা বলছেন, দাবি গুলোর মধ্য হরিদাসকে গ্রেপ্তার,খোলা আকাশের নিচে বিশাল বিশাল মুর্তি অপসারন,ফকির থেকে কোটিপতি হওয়ার কাহিনীর ষড়যন্ত্রে জড়িতদের চিহিৃত করা সহ দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি আদায়ে আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম চলবেই।
সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হরিদাসের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি, বদলি, হুন্ডি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিষয়ে অভিযোগ থাকায় সিআইডি প্রাথমিক অনুসন্ধান করে। তাতে দেখা গেছে, বৈধ কোনো আয়ের উৎস না থাকলেও তার বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এর প্রায়ই সবই তিনি উত্তোলন করেছেন, যা সন্দেহজনক। সিআইডি জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানের নানা ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ অর্থ হরিদাসের ব্যাংক হিসাবগুলোতে জমা করেছেন, যা তার পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এর আগে হেফাজতে ইসলাম,ইমাম- ওলামা পরিষদ সহ কয়েকটি ইসলামী সংগঠনের কয়েকদিনের টানা আন্দোলন – সংগ্রামের মুখে মন্দিরের হলরুমে এক সংবাদ সম্মেলনে, সমাজের ও দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে নির্মান কাজ স্থগিত ঘোষনা করেন মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত। এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস।
এবিষয়ে সোমবার সন্ধায় মুঠোফোনে হেফাজতে ইসলামের গাইবান্ধা জেলা কমিটির সেক্রেটারী ও কেন্দ্রীয় বড় মসজিদের খতিব, মুফতি মাহমুদুল হাসান বলেন, ধর্মের আড়ালে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওই সব মুর্তি নির্মিত হচ্ছ। এগুলো অপসারন সহ আমাদের ৫ দফা দাবি রয়েছে। দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন সংগ্রাম চলবেই।
একই কথা জানালেন ইমাম- ওলামা পরিষদের গাইবান্ধা জেলা কমিটির সেক্রেটারী হাফেজ মুফতি মানসুর রহমান। তিনি বলেন, খোলা আকাশের নিচে রামসহ তিনটি মুর্তি অপসারনের দাবি জানিয়ে আসছে মানুষ। দ্রুত অপসারন চাই। না হলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অতিদরিদ্র হরিদাস পাল (৪০) স্থানীয় বাজারে অনেক দোকানে চাল-ডাল ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাকি রেখে অভাবের তাড়নায় ভারতে চলে যান। সেখান থেকে দেশে এসে মন্দিরসহ প্রায় শতকোটি টাকার অবকাঠামো গড়ে তোলেন।
স্থানীয়দের দাবি,ভারতের দেওয়া টাকায় তিনি এই মন্দির গড়ে তুলেছেন। দরিদ্র হরিদাস পালের কোটি টাকার উৎস ও মন্দির নির্মাণের ঘটনা টক অব দ্যা কান্ট্রিতে পরিনত হয়েছিলো। জেলার সনাতনী নেতারাও তার টাকার উৎস জানতে চান এবং তাকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। হরিদাস পালের কোটিপতি হওয়ার কাহিনি খুঁজে বের করার দাবি জানিয়ে আসছে আনন্দোলনকারি ইসলামী দলগুলো।
স্থানীয়রা জানায়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কোমরপুরের মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস। অভাবের সংসারে অন্যের শুকরের পাল প্রতিপালন করতেন এবং বাঁশের ডালি কুলা চালুন তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন। কয়েক বছর আগে দুবলাগাড়ি এলাকার চাল ব্যবসায়ী আতাউর রহমানের কাছ থেকে নেওয়া কয়েক মন চালের টাকা বাকি রেখে হঠাৎ হাওয়া হয়ে যান তিনি।
পরে জানা যায়, হরিদাস ভারতে চলে গেছেন। কয়েক বছর ভারতে থেকে আবার চলে আসেন গাইবান্ধায় তার নিজ বাড়িতে। এরপর শুরু হয় তার আর্থিক উত্থান। ২০২০ সালে এসেই রামচন্দ্রপুর মুচান্নিদহ খাল ও শ্মশানের পাশে ৭৬ শতাংশ দেবোত্তর সম্পতি জুড়ে গড়ে তোলেন কালীমন্দির। শুরু করেন পূজা। কিছুদিনের মধ্যে তিনি বিশাল কালীমন্দির, গুরুকুলের আশ্রম, সেতু, কৃষ্ণ বিগ্রোহসহ বিশাল এলাকাজুড়ে ১৪৪টি দেবদেবীর প্রতিমা মন্দির গড়ে তোলেন। মন্দিরের চারপাশজুড়ে বড় বড় দালানকোঠা, খাবার ঘর, থাকার হোটেল নির্মাণ করেন।
তারা আরো জানায়, ডোম থেকে কোটিপতি বনে যাওয়া হরিদাস পালের আর্থিক উত্থান এবং ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও গুঞ্জন চলছে। হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের দরিদ্র গোপিনাথ চন্দ্র তরনী দাসের ছেলে। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে হরিদাস চন্দ্র চতুর্থ। তিনি সংসারে অভাবের কারণে বাঁশের ডালি কুলা চালুন তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন। হরিদাস চন্দ্রের বাবা ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়লে তাদের বসতবাড়ির ৯ শতক জমি বিক্রি করেন। হরিদাস চন্দ্রসহ তার চার ভাই গোবিন্দ চন্দ্র তরনী দাস, গৌরাঙ্গ চন্দ্র তরনী দাস, নিত্যনন্দ তরনী দাস ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার বাবা গোপিনাথ চন্দ্র, মা স্বর্গীয় দুর্গারানী তরনী দাস ও ছোট ভাই আনন্দ চন্দ্র তরনী দাস প্রথম দিকে গুচ্ছ গ্রামে বসবাস করতেন। তার মা দুর্গা দাস তরুনী দাসের মৃত্যুর পর ছোট ভাই আনন্দ চন্দ্র তরনী দাস বাবাকে নিয়ে বর্তমানে দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় বসবাস করছেন। পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র বোন দেবা রানী বৈবাহিক সুত্রে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় তার স্বামীর বাড়ীতে অবস্থান করছেন। হরিদাস চন্দ্র ২০১০ সালের দিকে বাংলাদেশে আসেন। তিনি প্রথমে ঢাকার উত্তরায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর আলোচিত সেই হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাসকে রোববার (১২ জুলাই) রাতে গাইবান্ধা জেলা পুলিশের সহায়তায় গ্রেপ্তার করেছে ঢাকার উত্তরার সিআইডি। পলাশবাড়ীর রাম মন্দির থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেফতারের বিষয়য়ি নিশ্চিত করে সোমবার সন্ধায় গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দীন মুঠোফোনে বলেন, হরিদাস চন্দ্র দাসের ব্যাংক হিসাবে সাড়ে ৯ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হয়। এ নিয়ে গত ২ জুলাই থেকে এই টাকার উৎস এবং বিভিন্ন তথ্যাদি অনুসন্ধান করছিল সিআইডি। অনুসন্ধান শেষে গতকাল রোববার তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের হয়। সেই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর সিআইডি রোববার রাতেই তাঁকে ঢাকায় নিয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি সিআইডি পুলিশের হেফাজতে চারদিনের রিমান্ডে রয়েছেন।।
এর আগে ২০২২ সালের ৭ নভেম্বর প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিয়ে স্বার্থ হাসিলের অভিযোগে হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসকে ঢাকার বনানী থেকে এনএসআইয়ের অভিযোগে গ্রেফতার করে Rab।
