সফিকুল ইসলাম: চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেয়া ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ফলে এবার পরীক্ষায় প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল দেখলো দেশ। পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এরমধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটিই কমেছে।
গত বছরের তুলনায় এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫ সালে এ পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অনলাইনে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, এসএসসিতে পাসের এ হার ২০০৭ সালের পর এবার সবচেয়ে কম। ওই বছর (২০০৭ সাল) পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর ১৯ বছরে আর কখনো পাসের হার এত নিচে নামেনি। কেন এ বিপর্যয়- তা নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে বেশি ফেল করায় এমন ফল বিপর্যয়। তাদের দাবি, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থীরা দুটি বিষয়ে ব্যাপক হারে ফেল করেছে। এ কারণে ফলাফলে গড় পাসের হারে ধস নেমেছে। যদিও শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য, এবার ফলাফল খারাপ নয়, বরং সুন্দর হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতের দুর্বলতা নতুন নয়। প্রতিবছরই এ দুটি বিষয়ে বেশি ফেল দেখা যায়। কেন শিক্ষার্থীরা ফেল করছে, তা মাঠপর্যায়ে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। উত্তরপত্র যত কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হোক না কেন, এতসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল গ্রহণযোগ্য নয়।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এবার গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন। বিদেশে মোট ৯টি কেন্দ্রে ৪০২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৫৪ জন, পাসের হার ৮৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছে ৪৮ জন। বিদেশের একটি কেন্দ্রে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেও একটি কেন্দ্রে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ফলাফলে এবারও ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ছাত্রীরা। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ছাত্রদের তুলনায় ১ লাখ ৭ হাজার ৯৮২ জন বেশি ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রীরা এগিয়ে; ছাত্রদের চেয়ে ১১ হাজার ৪০১ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে। ৯ টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের গ্রুপভিত্তিক ফলাফলেও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাসের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৭৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৮০ দশমিক ৯০ শতাংশ। মানবিক বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৫৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৫৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৬৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। ফলাফলের তুলনামূলক তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। এ বছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৭৪ হাজার ৬০১ জন। তবে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে রয়েছে ছাত্রীরা। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬.৬৮ শতাংশ। আর ছাত্রদের পাসের পার ৫৭.৮৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতেও এগিয়ে ছাত্রীরা। এ বছর মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। তাদের মধ্যে ছাত্রী ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন এবং ছাত্র ৫২ হাজার ৭৮০ জন। এবার পরীক্ষায় পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। তাদের মধ্যে ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন ছাত্রী এবং ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন ছাত্র।
চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি), দাখিল ও এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও অনুত্তীর্ণ (ফেল) শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯০ হাজার। ২০২৫ সালের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থী কমেছে ৭৪ হাজার ৬০১ জন। বিপরীতে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৯ হাজার ৯২৮ জন। সোমবার প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এদিন সকাল ১০টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পরীক্ষার ফল হস্তান্তর করেন। চলতি ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ অনুত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। অন্যদিকে ২০২৫ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন। সে বছর উত্তীর্ণ হয়েছিল ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। অর্থাৎ অনুত্তীর্ণ হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৬৬০ জন। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে পরীক্ষার্থী কমেছে ৭৪ হাজার ৬০১ জন। কিন্তু অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্টো বেড়েছে ৮৯ হাজার ৯৪৮ জন। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক পাসের হারেও। ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। ফলাফলের শীর্ষ সূচকেও অবনমন দেখা গেছে। ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থী। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। অর্থাৎ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। এবারের পরীক্ষায় পূর্ণ সিলেবাস ও পূর্ণ নম্বরে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ২০ মে পর্যন্ত চলে পরীক্ষা।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাস ৬৪.২৯ শতাংশ: ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এবার পাসের হার ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ লাখ ১৯ হাজার ৬৯৬ জন। পাস করেছে এক লাখ ৪১ হাজার ২৪৮ জন। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, মানবিকে এবার বিপর্যয় ঘটে গেছে। তারা ইংরেজি ও গণিতে খুব খারাপ করেছে। সেজন্য ফেলের সংখ্যাটাও মানবিকে বেশি। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ভালো করায় তাদের পাসের হার ও জিপিএ প্রাপ্তি ভালো। তিনি বলেন, মানবিকে কেন এমন হলো, তারা ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল কেন; তা খাতিয়ে দেখা হবে। কীভাবে মানবিকের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে হিসাববিজ্ঞানে পাসের হার মাত্র ২০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ এ বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৯ দশমিক ৬৬ শতাংশই পাস করতে পারেনি। সোমবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিষয়ভিত্তিক পাসের হারের এ চিত্র পাওয়া গেছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), পৌরনীতি, হিসাববিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, ইতিহাস ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের পাসের হার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ইংরেজি বিষয়ে ফল তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে দুর্বল। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। রাজশাহীতে ৭৪ দশমিক ৭০, কুমিল্লায় ৮১ দশমিক ২৯, যশোরে ৭১ দশমিক ৮৪, চট্টগ্রামে ৭২ দশমিক ২৭, বরিশালে ৬৯ দশমিক ২৪, সিলেটে ৬৯ দশমিক ১১, দিনাজপুরে ৭২ দশমিক ৯১ এবং ময়মনসিংহে ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করেছে। অন্যদিকে গণিতেও কয়েকটি বোর্ডে পাসের হার ৭০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। রাজশাহী বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৭৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, বরিশালে ৭৭ দশমিক ৯৮, সিলেটে ৭৫ দশমিক ৯৬, দিনাজপুরে ৭১ দশমিক ৫ এবং ময়মনসিংহে ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। দাখিল পরীক্ষার ক্ষেত্রে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৬৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে আইসিটি বিষয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেছে শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বোর্ডে এ বিষয়ে পাসের হার ৯৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ৯৯ দশমিক ৮৯, কুমিল্লায় ৯৮ দশমিক ৬৫, যশোরে ৯৭ দশমিক ৮৬ এবং চট্টগ্রামে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। বরিশাল, সিলেট, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ বোর্ডেও আইসিটিতে পাসের হার ৯৮ শতাংশের ওপরে। বাংলা বিষয়েও প্রায় সব বোর্ডেই পাসের হার ৯০ শতাংশের বেশি। ঢাকা বোর্ডে বাংলা বিষয়ে ৯৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, রাজশাহীতে ৯৮ দশমিক ৪, কুমিল্লায় ৯৮ দশমিক ৩৮, চট্টগ্রামে ৯৬ দশমিক ৮৬ এবং সিলেটে ৯৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নেও বেশিরভাগ বোর্ডে পাসের হার ৯০ শতাংশের ওপরে। তবে ময়মনসিংহ বোর্ডে রসায়নে পাসের হার ৮৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পদার্থবিজ্ঞানে ৮১ দশমিক ৩৩ শতাংশ ও রসায়নে ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ পাস করেছে। বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে উচ্চতর গণিতেও বোর্ডভেদে পার্থক্য দেখা গেছে। ঢাকা বোর্ডে এ বিষয়ে পাসের হার ৯১ দশমিক ১৪ শতাংশ হলেও বরিশালে তা নেমে এসেছে ৮০ দশমিক ১৮ শতাংশে। দিনাজপুরে উচ্চতর গণিতে পাসের হার ৯৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনীতিতেও বরিশাল ও দিনাজপুর বোর্ডে তুলনামূলক কম শিক্ষার্থী পাস করেছে। বরিশালে এ বিষয়ে পাসের হার ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং দিনাজপুরে ৭৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। বিপরীতে রাজশাহী বোর্ডে অর্থনীতিতে পাসের হার ৯৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর শিক্ষার্থীদের ফল তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের হিসাববিজ্ঞানে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখা গেছে। সেখানে প্রতি ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৮০ জনই এ বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় আইসিটি বিষয়ে খারাপ ফল করে শিক্ষার্থীরা। তবে এবার অধিকাংশ বোর্ডেই আইসিটিতে প্রায় শতভাগ পাস করেছে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, দিনাজপুর ও কারিগরি বোর্ডে এবার আইসিটিতে পাসের হার ৯৯ শতাংশের ওপরে। আইসিটিতে ৯৮ শতাংশ পাস করেছে ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও মাদরাসা বোর্ডে। আইসিটিতে এবার সর্বনিম্ন ফল যশোরে, বোর্ডে এ বিষয়ে পাসের হার ৯৭.৮৬ শতাংশ। এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে ভালো ফল দেখা গেছে। ১১টি বোর্ডের মধ্যে সাতটি বোর্ডে পদার্থে ৯০ শতাংশের ওপরে পাসের হার। বাকি তিনটি বোর্ডে ৮০ শতাংশের ঘরে। রসায়নেও ৯০ শতাংশের ওপরে পাসের হার রয়েছে ৮টি বোর্ডে। বাকি তিনটি বোর্ডেও ৮২ শতাংশের ওপরে পাসের হার। অন্যদিকে উচ্চতর গণিতে সব বোর্ডে ৯০ শতাংশের ওপরে পাসের হার রয়েছে। ইতিহাস, অর্থনীতিতেও পাসের হার সন্তোষজনক। তবে হিসাববিজ্ঞানে অধিকাংশ বোর্ডে পাসের হার ৮০ শতাংশের ঘরে।
বিগত ১৯ বছরে যেমন ছিল এসএসসির ফল: ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশের পাবলিক পরীক্ষায় ডিভিশন পদ্ধতি অর্থাৎ, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ছিল। ২০০১ সাল থেকে এসএসসিতে জিপিএ পদ্ধতিতে ফল প্রকাশ করা হয়, যেখানে পাঁচটি স্কেলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। ওই বছর পাসের হার ছিল ৩৫ দশমিক ২২। পরের বছর ছিল ৪০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। নতুন এ পদ্ধতি চালুর পর শিক্ষার্থীদের বুঝে উঠতে কিছুটা সময় লাগে। এ কারণে প্রথম তিন-চার বছর তুলনামূলক খারাপ ফলাফল দেখা যায়। ২০০৬ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২২ শতাংশ। এর পরের বছর আবারও ফল বিপর্যয় ঘটে। সেবার পাসের হার নেমে যায় ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে। এরপর আরও কখনো খুব বেশি নিম্নমুখী ফল দেখা যায়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে ফলাফলে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল। যদিও অভিযোগ ছিল, শিক্ষার্থীদের নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে ফলাফলে উল্লম্ফন ঘটানো হয়েছে। তবে শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী,২০০৮ সালের এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ১৮ শতাংশ, ২০০৯ সালে ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০১১ সালে এসএসসিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের ঘরে প্রবেশ করে। এরপর টানা সাত বছর ৮০ শতাংশের ওপরে পাসের হার দেখা যায়। ২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮৭ দশমিক ০৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৮০ দশমিক ২৫ শতাংশ পাসের হার ছিল। মাঝে ২০১৮ সালে এসএসসিতে পাসের হার কিছুটা কমে আসে। সে বছর পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮২ দমমিক ৮৭ শতাংশ। ২০২১ সালে করোনাভাইরাসের কারণে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও কম বিষয়ের ওপর এসএসসি পরীক্ষা হয়। সেবার দ্রুততম সময়ে ফল প্রকাশ করা হয় এবং পাসের হারও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ওই বছর পাসের হার ছিল ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। করোনার ধাক্কায় ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ সালেও সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ছিল। তবে এ তিন বছর সব বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এ তিন বছরে যথাক্রমে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ ও ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ২০২৫ সালে পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের ওপর এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাসের হার নিম্নমুখী দেখা যায়। ওই বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে বিএনপি। নতুন সরকারের অধীনে এসএসসি ও সমমানের মধ্য দিয়ে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। রীতি ভেঙে ৮২ দিন পর পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। তাতে বিগত ১৯ বছরের মধ্যে এসএসসিতে সর্বনিম্ন ফলাফলের রেকর্ড হয়েছে। এসএসসি ও সমমানের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার মোটাদাগে দুই কারণে পাসের হারে ধস নেমেছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের শিক্ষক আশরাফ উদ্দীন বলেন, আর্টসের (মানবিক বিভাগ) শিক্ষার্থীরা বরাবরই গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল থাকে। এটা আমার শিক্ষকজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। তবে এবার খুব বেশি খারাপ করেছে। ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, প্রশ্ন কঠিন কিংবা কঠোরভাবে খাতা মূল্যায়ন-যেটিই বলেন না কেন, কোনোভাবেই ফেল গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, প্রস্তুতির ব্যাপক ঘাটতি নিয়েই এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় বসে হোঁচট খাচ্ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী।
