বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, তীব্র লবণাক্ততা এবং কর্মসংস্থানের চরম সংকটে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার মানুষ প্রতিনিয়ত তাদের চিরচেনা জন্মভিটা ছেড়ে শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই মারাত্মক প্রভাবে উপকূলের হাজার হাজার পরিবার তাদের কৃষি ও ঐতিহ্যগত পেশা হারিয়ে খুলনা, ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে।
ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, তীব্র জলোচ্ছ্বাস এবং টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। জমিতে ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রথাগত কৃষি চাষাবাদ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাইলের পর মাইল এলাকায় পানের যোগ্য কোনো মিষ্টি পানি না থাকায় মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। কৃষি ও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাওয়ায় চরম কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হয়েছে। উপকূল থেকে পালিয়ে আসা এই বিশাল জনগোষ্ঠী টিকে থাকার শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে বিভিন্ন মহানগরের ঘিঞ্জি বস্তিগুলো। শহরে এসেও তাদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন ঘটছে না। সেখানে তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নিরাপদ আবাসনের অভাব স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট অনানুষ্ঠানিক খাতে। কম মজুরির কাজ সামাজিক সুরক্ষার অভাব এই জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জীবন রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং স্থানীয়ভাবে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি প্রয়োজন।
এদিকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯টি জেলার প্রায় ৩ কোটি মানুষ তীব্র সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে চারদিকে প্রচুর পানি থাকলেও খাওয়ার উপযোগী সুপেয় পানির অভাবে উপকূলের মানুষ ভিটেমাটি ও এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। জোয়ারের পানি ও লবণাক্ততা উপকূলের মাটি ও পানির উৎস নষ্ট করছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া। সুদূর দূর দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নারীদের। সুপেয় পানির অভাবে পানিবাহিত নানা রোগ ছড়াচ্ছে। কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং জীবিকা হারিয়ে মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার।
গত এক দশকে সিডর, আইলা, বুলবুল, ইয়াস, আম্পানসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, পাশাপাশি সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলজুড়ে নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে বিলীন হয়েছে অসংখ্য বসতভিটা। অনাবাদি হয়ে পড়েছে কৃষিজমি, কমেছে মাছ চাষ ও পশুপালনের সুযোগ। ফলে জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজারো পরিবার বাধ্য হচ্ছে জন্মভিটা ছেড়ে শহরমুখী হতে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও কর্মসংস্থানের সংকটে খুলনার উপকূলীয় এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ ছুটছেন শহরের দিকে। টিকে থাকার শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন খুলনা মহানগরের বস্তিগুলো। তবে শহরে এসেও মিলছে না নিরাপদ আবাসন, স্থায়ী কাজ কিংবা সামাজিক সুরক্ষা। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন উপকূল হারানো এসব মানুষ।
উপকূল ছেড়ে আসা জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় একটি অংশ এখন খুলনা শহরের শতাধিক বস্তিতে বসবাস করছে। কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, কেউ গৃহকর্মী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে কোনোমতে জীবন চালাচ্ছেন। শহরের স্থায়ী পরিচয়পত্র না থাকায় অনেকেই সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনিশ্চিত আয় এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধার অভাব তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শহরে বস্তির সংখ্যা বাড়তে দেয়া নয়, উপকূলে মানুষের টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। কর্মসংস্থান, টেকসই পুনর্বাসন, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা মোকাবিলা এবং দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের এই ¯্রােত আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়বে।
উপকুলবাসী জানায়, নদীর পানিতে লবণ বেশি, তাই এলাকায় ধান বা অন্য ফসল খুব একটা হয় না। মাছের ঘের বেশি। কিন্তু সেখানে কর্মসংস্থান হয় খুব কম মানুষেরই। বেশির ভাগ মানুষের প্রধান জীবিকা সারা দিন কোমরপানিতে ডুবে রেণুপোনা সংগ্রহ, মাছ ও কাঁকড়া ধরা। দেড় দশকে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মহাসেন এবং সর্বশেষ আম্পানের আঘাতে প্রমীলাদের মতো উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে। একসময়ের সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো জমি ও সম্পদ হারিয়ে দরিদ্র হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরের বস্তিগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ বাসিন্দাই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা জলবায়ু অভিবাসী। গত ১০ বছরে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূল ছেড়ে অন্তত ৩০ হাজার পরিবার এসব বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে।
কারিতাস খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক অ্যালবিনো নাথ বলেন, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। তারা শুধু আশ্রয় হারাচ্ছেন না, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও পিছিয়ে পড়ছেন। তাই বিষয়টিকে মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও আইনি সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি উপকূলে টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
