বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ মতামত সামাজিক অবক্ষয় ও আমাদের নীরব ঘাতক: সংকটের শিকড় কোথায়?

সামাজিক অবক্ষয় ও আমাদের নীরব ঘাতক: সংকটের শিকড় কোথায়?

মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা যখন সব সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সমাজ শুধু কষ্ট পায় না; ভেতরে ভেতরে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো আমাদের মনে সেই ভয়কেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি ছোট্ট শিশুর ওপর এমন নির্মমতা দেখে সবার মনে একটাই প্রশ্ন, একজন মানুষ কীভাবে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? কিন্তু প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দিলেই চলবে না। আমাদের আরও গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। এর জন্য কি শুধুই অপরাধীর বিকৃত মানসিকতা দায়ী, নাকি সমাজের ভেতরেই এমন কিছু “নীরব ঘাতক” তৈরি হচ্ছে, যা মানুষের বিবেক ও মানবিকতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে?

আজকের সমাজে সহিংসতা, খুন কিংবা নারীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকায় এমন সব খবর আসছে, যা আমাদের সমাজের মারাত্মক নৈতিক পতনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু কেন এই অবক্ষয়? কেন মানুষ নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না? কেন সমাজ থেকে দয়া-মায়া কমে গিয়ে এত নিষ্ঠুরতা বাড়ছে?

এই সংকটের পেছনে বেশ কিছু বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো মাদক। বর্তমানে দেশে ইয়াবা, কোকেনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন মাদক নেওয়ার ফলে মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। মাথার ভেতরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা লোপ পায়, যার কারণে মানুষ ভালো-মন্দের বিচার করতে পারে না। ফলে খুব সহজেই মানুষ অপরাধ ও সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এর পাশাপাশি আমাদের সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাও একটি বড় কারণ। এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাকে শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। এর ফলে কিছু মানুষ নারীকে সমান মানুষ হিসেবে সম্মান না করে, তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। এই ভুল মানসিকতা পরিবার ও সমাজ থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে বড় ধরনের অপরাধের জন্ম দেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব চেনা সমস্যার বাইরেও কিছু অদৃশ্য বা নীরব সংকট আমাদের সমাজকে ধ্বংস করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সীসা দূষণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার সীসাযুক্ত ব্যাটারি এবং সেগুলো যেখানে-সেখানে ভেঙে নতুন করে তৈরি করার কারণে বাতাসে ও পরিবেশে মারাত্মকভাবে সীসা ছড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন সীসার সংস্পর্শে থাকলে মানুষের মস্তিষ্ক ও আচরণের ওপর খুব খারাপ প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের বুদ্ধি ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তারা উগ্র হয়ে ওঠে।

শুধু সীসা দূষণই নয়, আমাদের খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদানের মিশ্রণ মানুষের শরীর ও মন দুটোই নষ্ট করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব বিষাক্ত উপাদান মানুষের মেজাজ খিটখিটে করে দেয় এবং আচরণগত ভারসাম্য নষ্ট করে। অর্থাৎ, পরিবেশের এই দূষণ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে নিঃশব্দে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, আমরা এখনো এই সমস্যাগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখছি। অথচ মাদক, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, পরিবেশ দূষণ এবং খাদ্যে ভেজাল—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে জড়িত। শুধু আইন দিয়ে বা ফাঁসি-কারাদণ্ডের শাস্তি দিয়ে এই অপরাধ কমানো সম্ভব নয়, যদি না আমরা এর আসল শিকড়গুলো উপড়ে ফেলতে পারি।

আজ আমাদের পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া এবং রাষ্ট্র সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে, পরিবার থেকেই ছেলে-মেয়ে সবাইকে একে অপরকে শ্রদ্ধা করার শিক্ষা দিতে হবে।

আমরা যদি এখনই এই নীরব ঘাতকদের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে সামনে আরও বড় সামাজিক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। তখন হয়তো আইন থাকবে, কিন্তু সমাজ তার মানবিকতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে।

লেখাঃ সাজেদা বিনতে হান্নান
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা